বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। দলের আমির মকবুল আহমদকে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে মূলত তুলে ধরেছেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটির ভূমিকাকেই। ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেছেন যে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছেন যাতে একাত্তরের ভূমিকার কারণে দলটি জাতির কাছ ক্ষমা চায়।
গতকাল শুক্রবার লন্ডন থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান ব্যারিস্টার রাজ্জাক। তার ব্যক্তিগত সহকারী কাউসার হামিদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তিনি দুটি কারণ উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম কারণ একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য দেশের মানুষের কাছে জামায়াতের ‘ক্ষমা না চাওয়া’। সময়ের দাবিতে সাড়া দিয়ে ‘বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে’ জামায়াতকে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থতা নিয়েও পদত্যাগপত্রে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের এক ঘণ্টার মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায় জামায়াতে ইসলামী। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাজ্জাকের পদত্যাগে তারা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যেকোনো সদস্যের স্বীকৃত অধিকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজ্জাকের পদত্যাগের ঘটনায় চরম হতাশ জামায়াতে ইসলামী। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এ ঘটনায় হতভম্ব ও বিস্মিত। একাত্তরে দলের ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি এবং জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিরোধ চলছিল ব্যারিস্টার রাজ্জাকের। গত তিন দিন সেই মতবিরোধ চরমে পৌঁছায়। শেষ পর্যন্ত বনিবনা না হওয়ায় গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শীর্ষ জামায়াত নেতাদের আইনজীবী দলের নেতৃত্বে থাকা ব্যারিস্টার রাজ্জাক।
তার এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দলের মধ্যে ভাঙন ও নতুন দল জন্ম নেওয়ার আভাস দিয়েছে দলের একটি অংশ। এই পক্ষের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমন হতে পারে তার নেতৃত্বে নতুন করে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগ জামায়াতে তীব্র বিভক্তি জামায়াতে ইসলামী রাজনীতি শুরু করবে।
লন্ডনে আইন পড়া রাজ্জাক ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে অ্যাডভোকেট হিসেবে এনরোলমেন্ট নেন। ওই সময় থেকেই তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয়। তবে আইনজীবী হিসেবে তার নাম আলোচনায় আসে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে তাদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে আদালতে দাঁড়ান রাজ্জাক।
কেন এই পদত্যাগ : ব্যারিস্টার রাজ্জাক বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। এসেক্সের বারকিং থেকে পাঠানো চিঠিতে তিনি এও বলেছেন যে, ক্ষমা চাওয়ার ইস্যুতে তিনি জামায়াতকে বিলুপ্ত করে দেওয়ারও প্রস্তাব করেছিলেন দলীয় ফোরামে। এ ছাড়া পদত্যাগপত্রে তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি, কিন্তু সে দাবি অনুযায়ী জামায়াত নিজেকে এখন পর্যন্ত সংস্কার করতে পারেনি।
চিঠিতে রাজ্জাক বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার করে জাতির সঙ্গে সে সময়ের নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ‘এই ক্রমাগত ব্যর্থতা জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে জামায়াত জনগণ, গণরাজনীতি এবং দেশবিমুখ দলে পরিণত হয়েছে।’ পদত্যাগপত্রে তিনি জামায়াতকে বিলুপ্ত করারও পরামর্শ দেন।
পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক বলেছেন, অতীতে অনেকবার পদত্যাগের কথা ভাবলেও তিনি নিজেকে বিরত রেখেছেন এই ভেবে যে, দলের সংস্কার করা সম্ভব হলে এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চাইলে তা হবে একটি ‘ঐতিহাসিক অর্জন’। ‘কিন্তু জানুয়ারি মাসে জামায়াতের সর্বশেষ পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে। তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। এখন থেকে আমি নিজস্ব পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চাই। সেই সঙ্গে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধিশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব।’
রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে এমনও বলেন, ২০০১ সালে জামায়াতের সে সময়ের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রী হওয়ার পর বিজয় দিবসের আগেই ১৯৭১ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন একটি কমিটি করা হয় এবং বক্তব্যের খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
এ ছাড়া ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকেও তিনি ক্ষমা চাওয়া ও দলের বিলুপ্তির প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন এবং ২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থার সময়েও তিনি জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।
জামায়াত ব্যথিত ও মর্মাহত : বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তারা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যেকোনো সদস্যের স্বীকৃত অধিকার। বিবৃতিতে বলা হয়, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকসহ আমরা দীর্ঘদিন একই সঙ্গে এই সংগঠনে কাজ করেছি। তিনি জামায়াতে ইসলামীর একজন সিনিয়র পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন। তার অতীতের সকল অবদান আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তিনি বলেন, আমরা দোয়া করি তিনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আমরা আশা করি, তার সঙ্গে আমাদের মহব্বতের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।
দলে ভাঙনের আভাস : আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দল ‘মর্মাহত’ ও ‘ব্যথিত’ বলে উল্লেখ করা হলেও রাজ্জাকের এই পদত্যাগে ভীষণ ক্ষুব্ধ দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। তাদের মতে, জামায়াতের চরম দুঃসময়ে এই পদত্যাগ দলকে ভীষণ বেকায়দায় ফেলল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কর্মপরিষদের কয়েকজন সদস্য দেশ রপান্তরকে বলেন, আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগে দলের সংস্কারপন্থি ও সংস্কারবিরোধী নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন স্পষ্ট হলো। এর মধ্য দিয়ে দলে ভাঙনের আভাস মিলছে। যেকোনো সময় রাজ্জাকের অনুসারী দলের নতুন ও তরুণ নেতাদের সংস্কারপন্থি অংশটির নেতৃত্বে নতুন সংগঠনের জন্ম নিতে পারে। একাত্তরে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ ইস্যুকে কেন্দ্র করে এই অংশ বহুদিন ধরেই দল থেকে বেরিয়ে নতুন সংগঠন করার ইচ্ছে প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু দলের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হওয়া মতিউর রহমান নিজামীর অনুসারী অংশটির বাধার মুখে পেরে উঠছে না তারা।
জামায়াতের কর্মপরিষদের ওই সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ঘিরে ও তৃতীয় দফায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানে থেকে দলের পক্ষে রাজনীতি করা সম্ভব নয় বলে শীর্ষ নেতাদের বুঝিয়ে আসছিলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নতুন নেতৃত্ব। এই অংশটি চাইছে একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে মুক্তযুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে সরে এসে উদারভাবে রাজনীতি করতে। দলের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে একাত্তরের পরে জন্ম ও মুক্তিযুদ্ধের পর দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতারা বর্তমান প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে রাজনীতি শুরু করার পক্ষে। কিন্তু দলের যুদ্ধাপরাধী নেতা ও তাদের অনুসারীদের বাধার মুখে তা হয়ে উঠছিল না। তাই বাধ্য হয়ে এই অংশ শেষ পর্যন্ত আবদুর রাজ্জাকসহ দলের একটি অংশের দ্বারস্থ হয়।
আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের কারণে দল ভেঙে যাচ্ছে কি না জানতে চাইলে এক কর্মপরিষদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা চাই বর্তমান কাঠামো ঠিক রেখে নতুন নামে নতুন সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার বৈঠকে এমনই আলোচনা হয়েছে। তবে কংক্রিট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই নেতা আরও বলেন, দল সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে শেষ পর্যন্ত নতুন সংগঠনের জন্ম হতে পারে। তবে সেটা আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে কি না তা নিশ্চিত করেননি তিনি।
রাজ্জাকের পদত্যাগের নানা দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন দলের শীর্ষ নেতারা। এমনকি সংস্কারপন্থিরাও। সংস্কারপন্থি অংশের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমন হতে পারে আবদুর রাজ্জাক ব্যক্তিস্বার্থেও পদত্যাগ করতে পারেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের রোষানলে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, লন্ডনে থাকা ব্যারিস্টার রাজ্জাক দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হতে পারেন। তার বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্ত করছে সরকার। এ ব্যাপারে সরকারের কাছেও তথ্যপ্রমাণাদি রয়েছে বলেও জানা গেছে। তাছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর দেশি-বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে লবিং ও অর্থায়নেও অভিযুক্ত তিনি। এমনও হতে পারে আবদুর রাজ্জাক সরকারের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতায় গেছেন নিজেকে বাঁচানোর জন্য। এমনটি হলে তার নেতৃত্বে নতুন সংগঠন করা সম্ভব কি না তা ভেবে দেখা হবে। তবে আপাতত এই অংশটি নতুন সংগঠনের পক্ষে। সেটা হতে পারে সামাজিক অথবা রাজনৈতিক। এর আগে এই অংশ জামায়াত ছাড়বে এবং একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইবে।