সোহরাওয়ার্দীর পাঁচ ওয়ার্ড বন্ধ রোগীরা ফিরছেন

রাজধানীর সরকারি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানান্তর হওয়া রোগীরা ফিরতে শুরু করেছেন। সীমিত আকারে নতুন রোগীও ভর্তি হচ্ছেন। হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ডটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আপাতত শিশুদের ফিরিয়ে আনা হচ্ছে না। দু-একদিনের মধ্যে হাসপাতালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। গত বৃহস্পতিবারের ওই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আলাদা দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের ভবনে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডের ১ হাজার ১৭৮ রোগীকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৮২৫ রোগী হাসপাতালে ফিরেছে। এদিন সকাল থেকেই স্থানান্তর হওয়া রোগীদের গ্রহণে অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ওয়ার্ডের রোগীদের অন্য ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ৮, ৯, ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড বন্ধ রয়েছে। নিচতলার স্টোর রুম থেকে শুক্রবারও পোড়া গন্ধ বের হয়েছে। রুমের ভেতরে কোনো কিছুই আর অক্ষত নেই। হাসপাতালটির ইতিহাসে এত বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এর আগে ঘটেনি বলে জানান কর্মকর্তারা। হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগবে বলে মনে করছেন তারা।

এদিন দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আসহাদুল ইসলাম। তিনি হাসপাতালের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখে দ্রুত মেরামতের নির্দেশ দেন। রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। আসহাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যে হাসপাতালের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি। ক্ষতিগ্রস্ত ইলেকট্রিসিটি লাইন মেরামতে ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করছে। ডাক্তার ও নার্সরা উপস্থিত আছেন। অধিকাংশ রোগীও চলে এসেছে।’

তদন্ত কমিটি গঠন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘আগুনের কারণ খুঁজে বের করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগুনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দ্রুত মেরামত করা হবে।’ ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালককে (অপারেশন) প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।’

রোগী গ্রহণে অস্থায়ী ক্যাম্প : অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছেড়ে যাওয়া রোগীদের গ্রহণ করতে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে হাসপাতালের প্রধান ফটকে অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। রাত ৯টা পর্যন্ত ক্যাম্প থাকার কথা রয়েছে। দুপুরে ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স ফরিদা ইয়াসমিন, নুরুজ্জাহান বেগম ও সালমা আক্তার বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে আমরা রোগী গ্রহণ শুরু করছি। বেশির ভাগ রোগী চলে এসেছে।’ তারা আরও বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কেয়ার হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাসপাতালে বেশি রোগী যায়। প্রাইভেট হাসপাতালেও বেশ কিছু রোগী রয়েছে।’

সন্ধ্যা ৬টায় ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র স্টাফ নার্স বিউটি রানী বলেন, ‘৮২৫ রোগীকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে অন্যান্য ফটক দিয়ে আরও রোগী এসেছে। শিশুদের ওয়ার্ডটি পুড়ে যাওয়ায় শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে না।’

হাসপাতালজুড়ে পোড়া গন্ধ : হাসপাতালের নিচতলায় আন্তঃবিভাগের ভেতরে ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল বিভাগ এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের ভেতরে স্টোর রুম। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত। এরপর দোতলা ও তিনতলার কেবিনে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার দুপুরেও স্টোর রুম থেকে পোড়া গন্ধ পাওয়া গেছে। রুমের ভেতরে রয়েছে হাঁটু পানি। রুমটির দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী জাকির হোসেন বলেন, ‘ভেতরের সবই পুড়ে গেছে। কোনো কিছু আর অবশিষ্ট নেই। আগুন লাগার সময় গেট বন্ধ ছিল। ভেতরে কেউ ছিল না।’

গাদাগাদি করে থাকছেন রোগীরা : হাসপাতালের বেশ কিছু ওয়ার্ড ও কেবিন আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ১, ৫, ৭, ১০ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে রোগী। নারী-পুরুষ সবাইকে একই ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে। মেরুদণ্ডের অপারেশন করা সাবিনা বেগম হাসপাতালে ফিরে জায়গা পেয়েছেন ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ফ্লোরে। তিনি এর আগে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ফিরে এসে বেড পাইনি। ফ্লোরেই শুয়ে আছি।’

অগ্নিকাণ্ডে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা : বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে আগুন লাগার সময় ৯ নম্বর মহিলা ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিলেন সিনিয়র স্টাফ নার্স ফেরদৌসী আক্তার বেগম। স্টোর রুমের ঠিক ওপরেই ৯ নম্বর ওয়ার্ড। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ ওয়ার্ডের ভেতর ধোঁয়া আসতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ওয়ার্ড অন্ধকার হয়ে যায়। এ সময় ওয়ার্ডে থাকা ২৬ জন রোগীকে দ্রুত বের করা হয়। রোগীদের উদ্ধার করতে গিয়ে বিউটি রানী হালদার নামে এক নার্সের হাতের কিছু অংশ পুড়ে গেছে।’

প্রসঙ্গত, আগারগাঁওয়ে অবস্থিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৫টা ৫০ মিনিটে আগুন লাগে। তারপর বিভিন্ন ওয়ার্ডে তা ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট টানা তিন ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলে রাত সাড়ে ১০টার দিকে হাসপাতালে আংশিক চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়।