বৃষ্টিভেজা মেলায়ও উপচে পড়া ভিড়

ঝড়-বৃষ্টিতে গতকাল রবিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার অর্ধশতাধিক স্টল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকাশকরা বলছেন, বৃষ্টির পানিতে হাজারো বই ‘পুরোপুরি নষ্ট’ হয়ে গেছে। তবে সকালে ঝুম বৃষ্টির পরও আগাম প্রস্তুতির কারণে বইমেলায় ক্ষতির পরিমাণ কম হয়েছে বলে দাবি করেছেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ। তবু বিকেলে প্রবেশদ্বার খোলার পর থেকেই মেলায় বইপ্রেমীদের ভিড় বাড়তে থাকে।

মেলা কমিটির সদস্য সচিব বলেন, ‘আবহাওয়া অফিস থেকে আমাদের জানানো হয়েছিল ১৬-১৮ ফেব্রুয়ারি বৃষ্টি হতে পারে। যার জন্য আমাদের দিক থেকে কিছুটা প্রস্তুতি ছিল। বৃষ্টির পরপরই ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা নিয়ে মেলার মাঠ থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৯০ শতাংশ স্টল সুরক্ষিত ছিল। তবে কয়েকটি স্টলের কিছু বই নষ্ট হয়েছে।’

বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘কয়েকটি স্টলে বৃষ্টির পানিতে ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রকাশকদের ঝড়-বৃষ্টি ও অগ্নিবিমা করা আছে। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে সব রকম সহযোগিতা করব।’  সরেজমিনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি স্টলের সামনে পানিতে ভেজা বই ছড়িয়ে রাখা হয়েছে রোদে শুকানোর জন্য। কোথাও কোথাও জমে আছে পানি। অর্ধশতাধিক স্টল বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অন্যপ্রকাশ, ইউনিভার্সিটি প্রেস (ইউপিএল), পাঠক সমাবেশ, আগামী প্রকাশনী, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, আদর্শ প্রকাশনী, বাবুই, জার্নিম্যান বুকস। শিশু চত্বরের কয়েকটি স্টলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যপ্রকাশের পরিচালক সিরাজুল কবির চৌধুরী কমল দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যপ্রকাশের স্টলে এক হাজারেরও বেশি বই বৃষ্টির পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু বিকেলে মেলার প্রবেশদ্বার খোলার পর থেকেই মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে; সন্ধ্যায় দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়।

এদিকে প্রতিবারই বৃষ্টিতে ভোগান্তির শিকার হওয়ার পরও স্থায়ী কোনো সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। সাহিত্যিক তাপস রায় বলেন, ‘প্রতিবারই ঘটনাটি ঘটে। ঝড়বৃষ্টিতে গ্রন্থমেলা ওলটপালট। বই ভিজে যায়, স্টলের অংশ ভেঙে পড়ে। বিষয়টি ভেবে উপায় বের করা উচিত, যাতে প্রকৃতিগত এই ক্ষতি এড়ানো যায়।’

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘তিন দিন আগেই বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদকে বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছি, তারা যেন নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন। এরপর প্রকাশকরা তাদের মতো ব্যবস্থা নিয়েছেন। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকেও বৃষ্টির পরপরই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতি বছরই মেলায় এরকম বৃষ্টির বিড়ম্বনা পোহাতে হয়। বইমেলার জন্য যদি নির্ধারিত একটি স্থান থাকত, তাহলে আমরা স্থায়ীভাবে কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারতাম। সেটা না হওয়াতে প্রতি বছরই আমরা মেলাকে কেন্দ্র করে কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করি। এবারও টিন, কাঠ দিয়ে স্টল নির্মাণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অফিস থেকে আমাদের জানানো হয়েছে, আগামী ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি আবারও বৃষ্টি হতে পারে। তার জন্যও আমাদের দিক থেকে প্রস্তুতি রয়েছে।’

নতুন বই

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বইমেলায় নতুন বই এসেছে ৭১টি। এর মধ্যে গল্পগ্রন্থ ৭, উপন্যাস ৭, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৩১, ছড়া ২, শিশুসাহিত্য ১, জীবনী ৩, মুক্তিযুদ্ধ ৩, ভ্রমণ ২, চিকিৎসা/স্বাস্থ্য ১, রম্য/ধাঁধা ১, ধর্মীয় ১, সায়েন্স ফিকশন ১, অন্যান্য ৩। এগুলোর মধ্যে মূর্ধন্য প্রকাশনী এনেছে মনজুরে মওলার ‘এলিয়ট-এর সময়’, অর্জন প্রকাশনী এনেছে মাসুম আওয়ালের ‘মিষ্টি একটা পরি’, বটেশ্বর ও বর্ণন এনেছে মঙ্গল কুমার চাকমার ‘বিবর্ণ পাহাড়’, আহমেদ পাবলিকেশন্স এনেছে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আত্মজীবনী ‘সিপাহী থেকে সুবেদার’।

লেখক বলছি

প্রতিদিনের মতো গতকাল রবিবারও প্রকাশিত নতুন বই নিয়ে ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে কথা বলেন পাঁচ লেখক। আলোচনায় অংশ নেন বদরুল হায়দার, ফরিদুর রহমান, মারুফ রসুল, সিগ্ধা বাউল, অঞ্জন আচার্য।

মূল মঞ্চ

গতকাল মূল মঞ্চে বিকেল ৪টায় হয় সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক : শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খালেদ হোসাইন। আলোচনায় অংশ নেন মফিদুল হক, আসাদ মান্নান, শিহাব সরকার ও আনিসুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি মনজুরে মওলা। সন্ধ্যায় কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি মোহাম্মদ সাদিক, খালেদ হোসাইন। আবৃত্তি করেন আবৃত্তিশিল্পী লায়লা আফরোজ ও মো. মাসুদুজ্জামান। মানজারুল ইসলাম সুইটের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী’ ও অনন্যা ওয়াফী রহমানের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘নৃত্যমঞ্চ’ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। সংগীত পরিবেশন করেন শাহনাজ নাসরিন ইলা, মামুন জাহিদ খান, মো. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া, রাকিবুল ইসলাম রাকীব, নীপা সাহা, শামীমা নাসরিন ও অপর্ণা খান। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন দীপক কুমার দাস (তবলা), শেখ আবু জাফর (বাঁশি), মো. বরকত নেওয়াজ (কী-বোর্ড) ও এসএম রেজা বাবু (ঢোলক)।

আজ মেলা আয়োজনে যা থাকবে

আজ সোমবার মেলা চলবে বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ জানান, বইমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রতি বছর শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এ বছর প্রথমবারের মতো ২০০৮-১৯ সাল পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিগুলো নিয়ে বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আজ বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করবেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। প্রদর্শনী চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিদিন মেলা চলাকালীন।