বঙ্গবন্ধুর ছবি না থাকা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি

তদন্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাফিলতির প্রমাণ

‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ বইতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ছবি না থাকা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতার প্রমাণ পেয়েছে। গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আল আমিন সরকার প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার পর আদালত শুনানি নিয়ে আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন ঠিক করেছে। ওই প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে।

বইটি প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত ও সংযোজিত ছবি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়েছে, বইয়ের সম্পাদনা কমিটির কাজের মধ্যে অসংগতি ছিল। তাদের কাজের ধারাবাহিকতা ছিল না; তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় ও নিয়মিত সভা হতো না। বইতে বঙ্গবন্ধুর ছবি না ছাপিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি থাকায় উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়া ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার না করা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ২ অক্টোবর বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের বেঞ্চ রুল জারির পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়। প্রথমে ৩০ দিন সময় দেওয়া হলেও একাধিকবার সময় বাড়িয়ে নিয়ে গতকাল প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়।

আদালতে রিটকারী আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের বইতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো ছবি নেই। অথচ তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং জাতির জন্য লজ্জাকর। শুধু তাই নয়, এই বইতে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও বিকৃত করা হয়েছে।’

তদন্ত কমিটি বলেছে, বইটিতে বিক্ষিপ্তভাবে লিপিবদ্ধ করায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা উল্লেখ থাকলেও ভাষণ দেওয়ার জায়গা রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কথা উল্লেখ নেই। জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বইতে উল্লেখ থাকলেও তারিখ (২৬ মার্চ ১৯৭১) উল্লেখ নেই। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার বিষয়ও বইতে উল্লেখ নেই।

প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নামকরণ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে। এ কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ছবি এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট বঙ্গবন্ধুর ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়নিÑ এ যুক্তি অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত। বঙ্গবন্ধুর ছবি অন্তর্ভুক্ত না করায় ইতিহাস বিকৃত হয়েছে বলে কমিটি মনে করে। বইটিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের দমনপীড়নের কথা উল্লেখ করা হলেও তার একাধিক ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা পরস্পরবিরোধী। বইয়ের পা-ুলিপির বিষয়ে ড. সনৎ কুমার সাহার মতামত অনুসরণ করা হয়নি।