কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের মধ্যে আলোচিত সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির ভাই আবদুস শুক্কুরসহ ১০ স্বজন জামিনের আবেদন করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আদালতে তাদের আবেদন নাকচ হলেও এ নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা। এদিকে দ্রুত জামিন পেতে আত্মসমর্পণকারীরা নানাভাবে তদবির চালাচ্ছে। এছাড়া আত্মসমর্পণের দিন হওয়া মামলা দুটি প্রত্যাহার বা দ্রুত শেষ করতে আবেদন করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা। কক্সবাজার জেলা আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. দিদারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মসমর্পণকারী ১০২ ইয়াবা কারবারি বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে। তাদের মধ্যে ১০ জনের জামিন আবেদন শুনানি শেষে নাকচ করে দেয় আদালত। তবে শুনানিকালে আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়নি।
ওই ১০ কারবারি হলো বদির ভাই আবদুস শুক্কুর, আমিনুর রহমান ওরফে আবদুল আমিন, শফিকুল ইসলাম ওরফে শফিক, ফয়সাল রহমান; ফুপাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল; ভাগনে সাহেদ রহমান নিপু; চাচাতো ভাই মো. আলম; খালাতো ভাই মং অং থেইন ওরফে মমচি এবং বদির ভাই শুক্কুরের ব্যবস্থাপক মারুফ বিন খলিল ওরফে বাবু ও মোজাম্মেল হক।
আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম জেরিন সুলতানার আদালতে ১০ ইয়াবা কারবারির জামিন আবেদনের শুনানি হয়। শুনানিকালে আইনজীবীরা দাবি করেন, আসামিরা আত্মসমর্পণের জন্য এক মাস ধরে পুলিশি হেফাজতে ছিল। সেখানে থাকা অবস্থায় তাদের কাছে ইয়াবা ও অস্ত্র কীভাবে আসল? তাদের জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরে বিচারক আত্মসমর্পণকারী কারবারিদের জামিন নামঞ্জুর করেন।
গত শনিবার টেকনাফ পাইলট স্কুল মাঠে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে অস্ত্র ও ইয়াবা জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে ১০২ ইয়াবা কারবারি। পরে ইয়াবা ও অস্ত্র আইনে হওয়া দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি এ দুই মামলায় আসামিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার ইঙ্গিত দেন।
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারী ১০২ জনের মধ্যে শুধু বদির ১০ স্বজনের আত্মসমর্পণের মাত্র চার দিন পর জামিনের আবেদন নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আত্মসমর্পণকারীরা তাড়াতাড়ি কারাগার থেকে বের হতে রাজনৈতিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে বদির পরিবারের সদস্যরাই বেশি চেষ্টা করছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তবে মাদক মামলায় তারা দ্রুত জামিন পাবে না। কারাগারে থেকে বের হতে তাদের অন্তত ছয় মাস লাগবে।’
‘আবদার’ বাড়ছেই আত্মসমর্পণকারীদের : আত্মসমর্পণকারী শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা ইয়াবা ও অস্ত্র আইনে হওয়া দুটি মামলা প্রত্যাহারে আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের স্বজনরা বলছেন, দ্রুত আইনি সমস্যার সমাধান হবেÑ এমন সবুজ সংকেত পেয়েই তারা আত্মসমর্পণে গেছে। শিগগিরই তারা বেরিয়ে আসবে বলেও তাদের জানিয়ে গেছে। কিন্তু ইয়াবা ও অস্ত্র আইনে হওয়া দুটি মামলা চলতে থাকলে তাদের জামিনসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হবে। তাই মামলা দুটি প্রত্যাহার করা হলে আইনি জটিলতা অনেকখানি কমে আসবে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের নামে থাকা সব মামলা পর্যালোচনা শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আত্মসমর্পণকারীরা জামিনে বের হয়ে এলেও তারা কঠোর নজরদারির মধ্যে থাকবে।’
আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আত্মসমর্পণকারী কারবারিদের মামলা প্রত্যাহারের আবদার নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়েছে। এর সঙ্গে আত্মসমর্পণের শর্তসহ অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয় জড়িত থাকায় হুট করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে র্যাবের কাছে জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের ঘটনায় হওয়া মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে পুলিশ। আত্মসমর্পণের চেয়ে কারবারিদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। সে ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা প্রত্যাহার করা হলে তাদের সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কারণ মামলা ঘাড়ে থাকলে তারা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়ার জন্য এক ধরনের চাপ অনুভব করবে।
এ বিষয়ে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিকটিমোলজি অ্যান্ড রেস্টোরেটিভ জাস্টিস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত আমরা আত্মসমর্পণকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। তবে মনে রাখতে হবে, এখানে রাষ্ট্রের চাপও ছিল যাতে তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। বড় ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সমঝোতামূলক আচরণ করতে হয় অনেক ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারে সজাগও থাকতে হবে। তাদের আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। তবে এমন কোনো সুযোগ দেওয়া ঠিক হবে না যাতে তার অপব্যবহার হতে পারে। আত্মসমর্পণকারী এবং এর বাইরে থাকা ইয়াবা কারবারি সবাইকেই কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, আত্মসমর্পণকারীদের সহসাই মুক্তি মিলছে না। এই দুটি মামলা প্রত্যাহার করা হলেও তাদের নামে থাকা পুরনো মামলার কারণে দেরি হবে। মামলার তদন্তের স্বার্থে তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে।