বঙ্গোপসাগরের তীরে চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল প্রত্যাশিত ‘বে-টার্মিনাল’ প্রকল্পে ১৪ মাসের মধ্যেই নির্মিত হবে কনটেইনার ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল। প্রকল্প এলাকা ভরাট করতে সাগর থেকে বালু উত্তোলনে চলতি সপ্তাহে নামানো হচ্ছে ড্রেজার। বন্দর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ট্রাকের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাক টার্মিনাল তৈরি করা হবে। সেখান থেকেই ট্রাকে করে আমদানি পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হবে। এতে বন্দরকেন্দ্রিক যানজটের পুরোপুরি অবসান হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ চলছে। ৮টি এস্কেভেটর ও ১০০টি ড্রাম ট্রাক এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। প্রকল্প এলাকা সমুদ্র থেকে ৩০ ফুট উঁচু করা হবে। তাই সমুদ্র থেকে বালু তোলার জন্য সেখানে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কাজ শুরু হবে।
নগরীর হালিশহরের আনন্দবাজার থেকে দক্ষিণ কাট্টলী পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরের তীরে প্রায় ৯০৭ একর জমির ওপর বে-টার্মিনাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে সাড়ে নয় মিটার গভীরতার জাহাজ ভেড়ানো যায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে অনায়াসে ১৪ মিটার গভীরতার জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া কর্ণফুলী নদীতে স্থাপিত চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে বর্তমানে জাহাজ প্রবেশ ও বের হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি জোয়ার ভাটার ওপর নির্ভরশীল। বে-টার্মিনালে জেটিতে জাহাজ ভেড়ানো কিংবা জেটি ত্যাগ করার ক্ষেত্রে এ সমস্যা থাকবে না। এর ফলে বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল অনেকাংশে কমে যাবে বলে অভিমত বন্দর কর্মকর্তাদের।
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামোর কাজ চলছে উল্লেখ করে বন্দরের ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান বলেন, প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে বেসরকারি মালিকানাধীন ৬৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার বন্দরের কাছে হস্তান্তর করেছে। এই জমিতে প্রথম ধাপে ডেলিভারি ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে সেখান থেকেই পণ্য ডেলিভারি দিতে চায় বন্দর। তিনি আরও জানান, আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার বন্দরে আসার পর তা সরাসরি বে-টার্মিনালের কনটেইনার ইয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হবে। এ কনটেইনার আনা-নেওয়ার জন্য পোর্ট এক্সেস রোড ও বর্তমান টোল রোড এককভাবে ব্যবহার করা হবে। তা ছাড়া বন্দর জেটি থেকে বে-টার্মিনাল পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে ‘ঈগল রেল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টিও বিবেচনাধীন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের এরই মধ্যে তিন দফা বৈঠকও হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রেলের মাধ্যমে ঘণ্টায় ৪০০ কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।
বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বে-টার্মিনাল’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে একটি এক হাজার ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, একটি এক হাজার ২২৫ মিটার দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার টার্মিনাল ও অন্যটি ৮৩০ মিটার দৈর্ঘ্যরে কনটেইনার টার্মিনাল-২। প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত ৯০৭ একর জমির মধ্যে ৮৩৯ একর সরকারি খাসজমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। জমিগুলো পাওয়ার পর সেখানে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করা হবে। ভারত, সিঙ্গাপুর, চীন, আরব আমিরাত, কোরিয়াসহ বেশ কটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্প বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে লিখিত প্রস্তাবনা দিয়েছে। প্রস্তাবনাগুলো যাচাই বাছাই চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষের।
বে-টার্মিনাল প্রকল্পে ডেলিভারি ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনালের ভৌত অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির গেটওয়ে। দেশের ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয় এ বন্দর দিয়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে হারে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাড়ছে, সে তুলনায় বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। তাই বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমরা দাবি জানিয়ে আসছি।’ তিনি বলেন, ‘নানা জঠিলতা পেরিয়ে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়া দেশের জন্য অবশ্যই একটি সুখবর। আশা করব সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।’