মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনায় বিশ্ব ইজতেমা সমাপ্ত

দেশের কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্য, আখিরাত ও দুনিয়ার শান্তি কামনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ৫৪তম বিশ্ব ইজতেমা। গতকাল মঙ্গলবার মাওলানা সা’দপন্থিদের পর্বের আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন দিল্লি মারকাজের মাওলানা মুহাম্মদ শামীম। বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে ১২টা ২ মিনিট পর্যন্ত মোনাজাত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হয় তাবলিগ জামাতের বৃহত্তম এই সম্মিলন। দুই হাত তুলে মহান আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানান লাখ লাখ মুসল্লি। মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ, বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত ও রহমত প্রার্থনায় চোখের পানি ফেলেন মুসল্লিরা। মোনাজাতে অংশ নিতে এদিন ভোর থেকেই লাখো মুসল্লি বিভিন্ন যান ও পায়ে হেঁটে ইজতেমা ময়দানে পৌঁছান। আখেরি মোনাজাতের আগে ময়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পরে মুসল্লিরা আশপাশের অলি-গলি, রাস্তা, বাসাবাড়ি, কল-কারখানার ছাদে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, টঙ্গী-ঘোড়াশাল ও কামারপাড়া সড়কে অবস্থান নিয়ে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। তুরাগ নদের নৌকায়ও ছিলেন অনেকে।

আগামী ইজতেমার তারিখ ঘোষণা সা’দপন্থিদের : টঙ্গীর তুরাগ তীরে আগামী বছরের ৩, ৪ ও ৫ জানুয়ারি ইজতেমা আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন সা’দপন্থিরা। বিশ্ব ইজতেমার মূল নজমের জামাতের সদস্য মো. হারুন-অর-রশিদ জানান, প্রাথমিকভাবে ওই তারিখ বাছাই করা হয়েছে। এছাড়া ইজতেমা ময়দানে তাদের পক্ষের পাঁচদিনের জোড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে এ বছরের ২২ থেকে ২৬ নভেম্বর।

এর আগে ১৬ ফেব্রয়ারি আখেরি মোনাজাতের পর মাওলানা জুবায়েরপন্থিরা ২০২০ সালের ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করেন। আগামী বিশ্ব ইজতেমা ১০, ১১ ও ১২ জানুয়ারি এবং ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি দুই পর্বে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তারা। পাঁচদিনের জোড় ইজতেমার তারিখ দেন চলতি বছরের ২৯ ও ৩০ নভেম্বর এবং ১, ২ ও ৩ ডিসেম্বর।

শেষ দিনের বয়ান : মঙ্গলবার বাদ ফজর উর্দুতে বয়ান করেন দিল্লির মাওলানা হাফেজ ইকবাল নায়ার। পরে বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের  মাওলানা মুফতি ওসামা বিন ওয়াসিফ। সকাল ১০টার দিকে উর্দু ভাষায় হেদায়েতি বয়ান করেন দিল্লির মাওলানা শামীম এবং বাংলায় তা তরজমা করেন মাওলানা আশরাফ আলী। তিনি বলেন, আল্লাহর জন্য দৈনিক অন্তত ৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হবে এবং মসজিদে কমপক্ষে ২০ জনকে দ্বীনের দাওয়াত দিতে হবে। পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করার নির্দেশনা দেন তিনি।

বিদেশি মেহমান : মাওলানা আশরাফ আলী জানান, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীনসহ প্রায় ৩৬টি দেশের তাবলিগ জামাতের সহস্রাধিক মেহমান এবারের ইজতেমায় অংশগ্রহণ করেছেন।

প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার বাদ ফজর আম বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের বিশ্ব ইজতেমা। প্রথম দুইদিন জুবায়েরপন্থিরা ইজতেমা পরিচালনা করেন। রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ইজতেমা পরিচালনা করেন সা’দপন্থিরা। এরপরই ইজতেমার মালামাল প্রশাসনের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে আয়োজক তাবলিগের মুরব্বিদের কাছে তা ফেরত দেবে কর্র্তৃপক্ষ।

তাবলিগের মুরুব্বিদের দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৪৬ সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমার আয়োজন শুরু হয়। তারপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজি ক্যাম্পে ও ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় ১৯৬৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বর্তমান স্থানে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সরকারিভাবে তুরাগ তীরের ১৬০ একর জমি স্থায়ীভাবে ইজতেমার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এবারের ইজতেমা নিয়ে শুরুতে অচলাবস্থা দেখা দেয়। গত বছরের ইজতেমায় দিল্লির মাওলানা সা’দ কান্ধলভীকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এই অবস্থায় ২০১৮ সালের বিশ্ব ইজতেমার পর তাবলিগ জামাতের দুইপক্ষ আলাদাভাবে ইজতেমার তারিখ ঘোষণা করে। মাওলানা সা’দের অনুসারীরা ১১, ১২ ও ১৩ জানুয়ারি এবং জুবায়েরের অনুসারীরা ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি ইজতেমার তারিখ নির্ধারণ করেন। এ নিয়ে সারা বছরই উত্তেজনা থাকে। দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন হয় এবং একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে থাকেন। বিরোধ এতটাই প্রকট হয় যে, গত ১ ডিসেম্বর ইজতেমা ময়দানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে দুজন নিহত ও শতাধিক আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন। এরপর সরকারের হস্তক্ষেপে দুই পক্ষের সমঝোতায় প্রথমে চারদিন ও পরে সা’দপন্থিদের আবেদনে পাঁচদিনে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়।