১. ১৯০৫ সালের জাপান-রাশিয়া যুদ্ধ নানান কারণে ঐতিহাসিক গুরুত্ব পায়। ইউরোপীয়রা যে অপরাজেয় নয়, আধুনিকতা যে তাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, এই যুদ্ধ সেই ভরসা জাগিয়েছিল দেশে দেশে। এই যুদ্ধেও কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল প্রযুক্তি ও জ্ঞানকে মাতৃভাষায় আত্মীকরণের জাপানের ভূমিকা।
জাপান কত দ্রুত প্রযুক্তিতে এগিয়ে গিয়েছিল, তার একটা নজির তারা সুশিমার নৌযুদ্ধে রাশিয়ার নৌবহরকে বিধ্বস্ত এবং অবশিষ্টটুকুকে আত্মসমপর্ণে বাধ্য করে দুনিয়ার সামনে রেখেছিল। স্থলযুদ্ধেও রুশরা পরাজিত হয়েছিল। সেই যুদ্ধে নতুন একটা প্রযুক্তি বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, বিশেষ করে অংশত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বাঙালি এক বিজ্ঞানীর নাম যে যুগান্তকারী আবিষ্কারের সপয়মড় জড়িত- বেতার যন্ত্র। যুদ্ধটুকু বাদ দিলে প্রযুক্তি একটা সমাজে কতভাবে আত্ম¯’ হতে পারে, তার দুটো পৃথক ও ভিন্ন ভিন্ন নমুনাও এই যুদ্ধের সময়ে রুশ ও জাপানি সমাজের ক্ষমতাবানদের ভাবনা ও কর্মে প্রকাশিত হয়েছিল, দুটোর ফলাফলও ছিল দুই রকম।
প্রায় একই সময়ে জাপান ও রাশিয়া উভয়েই তারহীন সেই যোগাযোগ প্রযুক্তি বেতারের সঙ্গে পরিচিত হয়। জাপানিরা প্রযুক্তিটার ব্যবহার দেখে যুক্তরাষ্ট্রে, ১৮৯৭ সালে। সাধারণভাবে যোগাযোগের প্রয়োজনে এবং বিশেষভাবে যুদ্ধে এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেও ব্যয়বহুল মনে হওয়াতে জাপানিরা নিজেরাই বেতারযন্ত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়, অধ্যাপক সানকিচি কিমুরার নেতৃত্বে একটা বেতার গবেষণা পর্ষদ গঠন করে তারা। ১৯০১ সালের মধ্যেই মোটামুটি ৭০ মাইল দূরত্ব পর্যন্ত যোগাযোগে সক্ষম বেতার প্রযুক্তি উন্নয়নে তারা সক্ষম হলে নৌবাহিনী এই বেতারপ্রযুক্তি গ্রহণ করে। ১৯০৩ সালে জাপানেই গবেষণাগার ও কারখানা নির্মাণ করা হয় আরও উন্নয়ন ও উৎপাদনের জন্য। কষ্টের টাকার যথাসাধ্য বিবেচক ব্যবহার যাকে বলা যায়।
রুশ সাম্রাজ্যের প্রজারাও গরিব ছিল বটে, কিন্তু রুশ ধনীরা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী আর ফুর্তিবাজ। জারের শাসন বলে কথা। যোগ্য মানুষ অনেক ছিলেন, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলো ছিল মোসাহেবদের দখলে। টাকা তো কোনো বিষয়ই ছিল নাÑ চাষারা জোগাতো খাজনা, বাংলাদেশে এখন যেমন পোশাক খাতের মেয়েরা কিংবা প্রবাসী শ্রমিকরা জোগান।
ফলে রুশরা কিনলো দেখেশুনে সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে অগ্রসর সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো হ্যাঁ, অত্যাধুনিক জার্মান বেতার যন্ত্র। যদিও জাপানিদের বেশ আগেই বিখ্যাত রুশ বিজ্ঞানী আলেক্সান্ডার স্তেপানোভিচ পাপোভ নিজস্ব রুশ বেতার প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন। জার্মান বেতারের আগমনে দেশজুড়ে হইচই পড়ে গেল, রুশরাও কত ‘এগিয়ে গেছে’, তারা আর পিছিয়ে নেই, জার্মান বেতার যন্ত্র তারা নিজেদের নৌবহরে যুক্ত করেছে এ নিয়ে আহ্লাদেরও শেষ ছিল না। কে কত ভাগ পেয়েছিল, তার খুঁটিনাটি বিবরণ ইতিহাস বইতে হয়তো পাওয়া যাবে, হয়তো যাবে না। তবে মূল বিষয় ছিল ওইটাই, গরিবের দেওয়া খাজনা যখন আসছে এত অঢেল, কে আর কষ্ট করে দেশেই কারখানা বানায়! আর যত লোককে সত্যিকারের মানসম্পন্ন শিক্ষা দেবে, তত বেশি বেয়াদব হতে থাকবে, অবাধ্য হবে, প্রশ্ন করবে। তারচেয়ে জার্মান যন্ত্র ভালো।
তো রুশ-জাপান যুদ্ধটা যখন লাগল, জাপানিরা নিজেদের বেতারে নিজেরা নিজেদের ভাষায় যোগাযোগ করতে পারল, নষ্ট হলে নিজেদের কারিগরই সব কাজ করল। প্রযুক্তিটার আগাপাশতলা তারা বুঝে নিয়েছিল, কারণ তা নিজেদেরই বানানো। নিজেরাই প্রয়োজনীয় উন্নয়নটুকুও করে নিলো। দক্ষ জনবল তাদের তৈরিই ছিল প্রযুক্তি আত্মস্থকরণ প্রক্রিয়াতেই। বুঝতেই পারছেন, রুশদের কী দশা ঘটল অত দামি জার্মান বেতার যন্ত্র নিয়ে, যার খুচরা যন্ত্রাংশ বিদেশি, প্রযুক্তি বিদেশি, কারিগর বিদেশি। কপাল ভালো তাদের, খোদ জার্মানদের সঙ্গেই সেবারের যুদ্ধটা হয়নি।
যুদ্ধটুদ্ধ বাদ দিলেও, ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে শেখার কিছু আছে। প্রয্ুিক্ত কখন একটা সমাজে শৌখিন বিলাস বা কল্পনাতীত দুর্নীতির হাতিয়ার কিংবা চোখ ধাঁধানো চমক হয়, বাকি সমাজকে সামান্যই এগিয়ে দিয়ে, কখন প্রযুক্তি সমাজের ভেতর থেকে বদল আনে জ্ঞানটা আত্মস্থ করে, খোলনলচে পালটে দেওয়ার ভূমিকা রাখে, সেটাই আসল কথা। দেখতেই পাচ্ছেন, বেতার প্রযুক্তির উদ্ভাবক জগদীশের দেশটাও মাতৃভাষায় প্রয্ুিক্তর ব্যবহারে বাকি দুনিয়ার থেকে কত ‘এগিয়ে গেছে’, দেশীয় কোনো বিশেষজ্ঞ ছাড়াই, দেশীয়দের প্রায় কোনো ভূমিকা ছাড়াই আমরা আজ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বলুন, আর উপগ্রহই বলুন, জারের রাশিয়ার চেয়ে পিছিয়ে নেই।
২. কেনিয়ার বরেণ্য ঔপন্যাসিক নগুগি ওয়া থিয়ঙ্গো ‘আমাকে আমি হতে শেখাও’ শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলেন। নগুগি সব সময়েই বিশ্বাস করতেন, বিদেশি ভাষা হলো আফ্রিকাকে উপনিবেশের জালে, অবিকাশের অভিশাপে আটকা রাখার বড় হাতিয়ার। আর এই প্রকল্পটা বাস্তবায়ন করছে এমন একটা অভিজাত শ্রেণি, ইংরেজি বা ফরাসি যাদের জ্ঞান অন্বেষণের বাহন নয়, মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধ করার উৎস নয়, বরং এমন একটা ক্ষমতার মাধ্যম যা রাষ্ট্রে বিভাজন টিকিয়ে রেখে কায়েমি গোষ্ঠীটির শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত রাখে।
১৯৬৯ সালের একটা ঘটনা লিখেছিলেন তিনি: নাইরোবি থেকে প্রায় একশ মাইল দূরের নায়েরিতে একজন বাইসাইকেল কারিগর, নামটা তার গাকামবা, স্কুটারের ইঞ্জিন ব্যবহার করে একটা ছোটখাটো বিমান বানিয়ে ফেলল। নানান বাতিল সব লোহালক্কড় ব্যবহার করে কাঠামোটা বানাল সে। খেলনা নয়, দিব্যি কয়েক মাইল উড়েটুড়ে অবতরণের সময়ে একটা গাছের মাথায় ভূপাতিত হলো বিমানটা। সদ্য স্বাধীন কেনিয়ার তখনকার অ্যাটর্নি জেনারেল চার্লস নজোনজো গাকামবার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেন, সরকারি অনুমোদন ছাড়া আর যেন বিমান ওড়াতে সে না পারে। কেননা, তার ‘আদিম বিমানটি’ নিশ্চিতভাবেই ততদিনে ইউরোপে বিমান নির্মাণের অগ্রগতির মানদণ্ডের ধারেকাছেও ছিল না। বিমান তো স্বাধীন কেনিয়া পশ্চিম থেকে আমদানি করলেই পারে! তো নগুগি বলেছেন, রাস্তার ধারের কারিগর গাকামবা পড়াশোনায় হয়তো মাধ্যমিকও পার হননি, ওদিকে তার সময়ে দেশের অন্যতম উচ্চশিক্ষিত মানুষ এই প্রধান আইন কর্মকর্তা নজোনজো ‘নাক দিয়েও’ ইংরেজি বলতে পারতেন। পার্থক্যটা দুজনের এই যে, গাকামবা নিজের স্বপ্নটা দেখতে চেয়েছে, অন্যদিকে নজোনজো অন্যদের দেখা স্বপ্নে নিজে গৌরবান্বিত হতেন। অশিক্ষিত কারিগর গাকামবা বলেছিল, কেনিয়াতে বিমান বানানো সম্ভব, আর তা প্রমাণ করেছিল নিজের আশপাশে যা আছে তাই দিয়ে আস্ত একটা বিমান বানিয়ে ফেলে, ইংরেজি বলা অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছিলেন, আমরা পারব না। নজোনজো অসম্ভবের কবল থেকে সম্ভবকে উদ্ধার করতে চেয়েছিলেন, নজোনজো তার নিখুঁত ব্রিটিশ উচ্চারণে হুমকি দিয়েছিল: এমনকি চেষ্টাটাও করবে না।
ভাষা নিয়ে হুবহু একই রকম একটা গল্প সত্যেন বোসও বলেছিলেন, ভারত আর চীন নিয়ে। ১৯৬২ সালে চীন আক্রমণ করতে গিয়ে বিপর্যস্ত ভারতের দশা দেখে তার উপলব্ধি হয়েছিল, চীন এত অল্প সময়ে অগ্রগতি লাভ করেছে, কারণ মাতৃভাষায় সে গোটা দুনিয়ার বিজ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিল, তাই জাতীয় রূপান্তর সম্ভব হয়েছিল। ভারতে (একই কারণে পাকিস্তান ও বাংলাদেশও) অভিজাত শ্রেণির ক্ষমতার স্বার্থে জ্ঞানের মাধ্যম হয়েছে ইংরজি। তার ফলও আজকের ভারত আর চীনের দুস্তর ফারাকে।
৩. প্রায়ই কেউ কেউ ভুল বোঝেন, বলেন, আপনারা ইংরেজি ভাষাকে তুলে দিতে চান! আমরা কিন্তু চাই উল্টোটা। পুরো জাতির ওপর থেকে বিদেশি ভাষার বোঝাটাই কেবল আমরা তুলে দিতে চাই, যাতে নিজের ভাষায় শিশুরা জ্ঞান চর্চা করতে পারে, মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। সারা দুনিয়ার জানালাটা আমরা বাংলায় খুলে দিতে চাই। ফলে ইংরেজের সঙ্গে ভাব বিনিময় করতে হবে, এমন শতকরা দশমিক এক ভাগের জন্য বাকি সকলকে ইংরেজিতে বাধ্য করার বিশাল শ্রম ও সম্পদের অপচয় থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হলে কিন্তু ইংরেজিসহ আর সব ভাষাতে বিশেষজ্ঞের চাহিদা বহুগুণ বাড়বে।
শেখবার একটা বিষয় হিসেবেই যাদের ভাষা শিক্ষায় আগ্রহ আছে, তারা সমাজে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন। আমাদের আশপাশে কত মানুষই তো উত্তম ফারসি, সংস্কৃত, আরবি, স্প্যানিশ, ফরাসি, উর্দু জানেন। সারা বিশ্বের জ্ঞান দেশি ভাষায় আনার তো কোনো বিকল্প নেই এই জ্ঞানচর্চার বিকাশ করতে গেলে। অনুবাদ গ্রন্থের চাহিদা বহুগুণ বাড়বে, যদি দেশিভাষায় সত্যিকারের জ্ঞানচর্চা সম্ভব হয়। অনুবাদ গ্রন্থের চাহিদা বাড়া মানেই আর্থিক, সামাজিক ও মর্যাদার দিক দিয়ে বিদেশি ভাষা শিক্ষার গুরুত্বও বাড়বে। এই এক অদ্ভুত বিষয়: নিজ ভাষার প্রতিষ্ঠা যে সমাজে ঘটবে, বিদেশি ভাষা চর্চার মানের গভীরতা ও ব্যাপকতা সেখানে অর্থপূর্ণভাবেই বাড়বে।
সকলের প্রয়োজন মেটাতে আরবি, সংস্কৃত, ইংরেজি, ফারসি, ফরাসি, জার্মান, উড়িয়া, বর্মি কি অহমিয়া ভাষা থেকেও নিত্যনতুন প্রয়োজনীয় গ্রন্থ ও রসদ বাংলায় অনুবাদ হবে। দুনিয়ার সব দেশেই অল্প কিছু মানুষ একাধিক ভাষা শেখেন, ফলে অধিকাংশ দায়মুক্ত হন, যেমন কেউ পদার্থবিদ হন, কেউ চিকিৎসক। কিন্তু সকলকে দ্বিভাষী বানানো খুব ছোট জনসংখ্যার কিছু দেশে বা অতি সম্পদশালী কিছু দেশে সম্ভব হলেও জ্ঞানার্জনের ভাষা প্রায় সর্বত্রই দেশি ভাষাই। চীনা বা জাপানি কিংবা কোরীয় ঠিক হিসাব কষে দেখেছে, কোটি কোটি শিশুকে বিদেশি ভাষায় উদ্ভিদবিদ্যা শেখাবার চেয়ে মাতৃভাষায় দর্শনের, পদার্থবিদ্যার, রসায়নের বইগুলো অনুবাদ করে ফেলা ঢের সহজ সাধ্য।
একই সঙ্গে চাই, সকল শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ। তার মানে বাংলার নিচেও কোনো ভাষাকে চাপা দেওয়া চলবে না। চাকমা, মারমা, মান্দি কি সাঁওতাল শিশু, তারাও শিক্ষা পাক নিজের ভাষায়।লেখক
প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও রাজনৈতিককর্মী