উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের অক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)। একই সঙ্গে অনুমোদন হওয়ার পরও কাজে গতি না থাকায় ৯ প্রকল্প নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তারা। এই অবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রস্তুত থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত ধীরগতির কারণ সমাধানে বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে জাপানের রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি।
সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সঙ্গে জাইকার উচ্চ পর্যায়ের ঋণ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বাস্তবায়নকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। কার্যবিবরণী অনুসারে, জাইকার অর্থায়নে চলমান রয়েছে ৩৩টি প্রকল্প। এসবের অধীনে চলতি বছরে ১৩৪ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের সমপরিমাণ অর্থ ছাড় করার কথা। প্রতিশ্রুত সময়েই পুরো অর্থ ছাড় করতে চায় সংস্থাটি। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো অর্থ ব্যয়ে অপারগতা প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে এডিপির সংশোধনীতে তা প্রস্তাবও করেছে। এই প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাইকা।
সভায় জাইকার বাংলাদেশ অফিসের সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ টারো কাতসুরাই বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩ সালে ৯৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন সমপরিমাণ সহযোগিতা করলেও ২০১৮ সালে তা ২০০ বিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। এই অবস্থায় চলতি অর্থবছরেও প্রতিশ্রুতির পুরো অর্থ পরিশোধ করতে চায় জাপান। ডিসেম্বর নাগাদ ১০০ বিলিয়ন ইয়েন অর্থ ছাড় করা হয়েছে, যা মোট প্রতিশ্রুতির প্রায় ৭৫ শতাংশ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৯টি প্রকল্প পুরোপুরি বেহাল অবস্থায় আছে। এর মধ্যে এমএনসিএই অ্যান্ড হেলথ সিস্টেম ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প এবং ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড এনহেজমেন্ট প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য। যদিও এগুলোর ঋণচুক্তি হয়েছে ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে। এই অবস্থায় রয়েছে চিটাগং সিটি আউটার রিং রোড প্রকল্প, ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন প্রকল্প, স্মল ওয়াটার রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প। এছাড়া চলতি বছরের বাস্তবায়নের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে রয়েছে ইনক্লুসিভ সিটি গভর্ন্যান্স প্রকল্প, উপজেলা গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, ঢাকা চিটাগাং মেইন পাওয়ার গ্রিড স্ট্রেনদেনিং প্রকল্প, রিনিউএবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, আরবান বিল্ডিং সেইফটি প্রকল্প, ওয়েসটার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্প এবং নর্দার্ন বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প।
প্রতিবেদন অনুসারে, চলমান ৩৩ প্রকল্পের মধ্যে ৮ প্রকল্পের অগ্রগতি শূন্য শতাংশ। ৪ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫ শতাংশের নিচে। তবে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে লক্ষ্যের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। সন্তোষজনক অগ্রগতির মধ্যে মেট্রোরেল, ক্রসবর্ডার কানেকটিভিটি নেটওয়ার্ক প্রকল্প, কর্ণফুলী ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প, হাওর ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প রয়েছে।
সভায় জাইকার বাংলাদেশ অফিসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুমন দাশগুপ্ত বলেন, তিনটি কারণে বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছেÑ প্রকল্পের অনুমোদন পর্যায়ে দেরি, মানসম্মত বাস্তবায়নে ধীরতা ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ ব্যবহারে অক্ষমতা। এর কারণ হিসেবে ডিপিপি প্রস্তুতে দুর্বলতা, স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির ঘাটতি, জমি অধিগ্রহণে জটিলতা ও চুক্তি অনুসারে প্রকল্পে যথাযথ বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবকে তুলে ধরেন তিনি।
সভায় জাইকার পক্ষ থেকে জনগণের জন্য প্রকল্পের সুফল নিশ্চিত করতে ডিপিপি তৈরি থেকে অনুমোদন পর্যায় থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ আরও দ্রুত সময়ে শেষ করারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রকল্পে গতি আনতে বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। সভায় ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ও আমেরিকা-জাপান উইংয়ের প্রধান শহিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন কারণে প্রকল্পে বাস্তবায়নের গতি আনা যাচ্ছে না। আমরা প্রকৃত সমস্যার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্যোগ দেখতে চাই।
সম্প্রতি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সঙ্গে বাংলাদেশ জাইকার প্রধান প্রতিনিধি হিতোশি হিরাতার নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করেন। এ সময় আগামীতে জাইকা এ দেশে ঋণপ্রবাহ আরও বাড়াবে বলে আশ্বাস আসে। ঋণ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়লে জাইকার ঋণও সে অনুযায়ী বাড়বে বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রক্রিয়ায় গতি আনতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে জাইকা সহায়তা দিতে চায়। পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে তারা এ বিষয়ে কাজও শুরু করেছে।
ইআরডি জানায়, ৩৯তম লোন প্যাকেজের আওতায় ছয় প্রকল্পে জাইকার সঙ্গে ১৮০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয় গত অর্থবছরের শেষের দিকে। চলতি অর্থবছরের শেষ দিকে ৪০তম প্যাকেজের জন্য চুক্তি সই হবে। এ প্যাকেজে জাইকার কাছ থেকে ২৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়া যাবে। এরমধ্যে জাইকা ও ইআরডি প্রাথমিকভাবে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সবচেয়ে সহজ শর্তে ঋণ পায় জাইকার কাছ থেকে। জাইকার নতুন ঋণের সুদহার হতে পারে ১ শতাংশ। ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। ৪০তম লোন প্যাকেজে এমআরটি-১ সহ মোট পাঁচ প্রকল্পে ঋণ পাওয়া যাবে। প্রকল্পগুলো হলোÑ মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র, এমআরটি-১, বিদেশি বিনিয়োগ সহায়ক প্রকল্প জ্বালানি দক্ষতা ও সুরক্ষা সহায়ক প্রকল্প। প্রস্তাবিত ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-১) প্রকল্পের আওতায় পাতাল রেলের দুটি অংশ থাকবে। প্রথমটি হবে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত। এর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার। দ্বিতীয় অংশটি হবে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মোট ১০ দশমিক ২০ কিলোমিটার।