মৃত্যুর মিছিল নিমতলী থেকে চকবাজারে

চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭০ জন মানুষ নিহত এবং আরও অর্ধশত মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। বুধবার রাতে লাগা আগুনে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে দাউ দাউ পুড়তে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় যে নির্মম ট্র্যাজেডি তৈরি হয়েছে তা বর্ণানাতীত। ফায়ার সার্ভিসসহ এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ধার তৎপরতার মাঝেই মানুষের কান্নার রোল আর স্বজনের আহাজারিতে ভারী আজ পুরান ঢাকার আকাশ-বাতাস। চকবাজারের এই এলাকাটি মূলত প্রসাধনী ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরির কাঁচামালের গুদাম ও বেচাকেনার কেন্দ্র। এ অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে নারী-শিশু-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, ক্রেতা, সাধারণ পথচারী, বিয়েবাড়ির মেহমানসহ নানা শ্রেণিপেশার নানা বয়সী মানুষ রয়েছে। চুড়িহাট্টার এই ট্র্যাজিক অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের স্মরণে শোক এবং তাদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানাচ্ছি আমরা।

মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, এটাই ইতিহাসের সাধারণ শিক্ষা।  নিমতলী ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নিলে আজ হয়তো চকবাজারে ওই একই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হতো না। প্রায় নয় বছর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদামে আগুন লেগে প্রাণ হারান অন্ততপক্ষে ১২৪ জন। রাসায়নিকের দাউ দাউ আগুনে নিমিষেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। ‘নিমতলী ট্র্যাজেডি’ হিসেবে পরিচিত ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত কার্যত ফাইলবন্দি থেকে যায় কেরানীগঞ্জে প্রস্তাবিত ‘কেমিক্যালপল্লী’ গড়ার উদ্যোগ।   

মারাত্মক দাহ্য এমন সব রাসায়নিক আমদানি ও গুদামজাত করতে হলে সরকারের বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিতে হয় কিন্তু প্লাস্টিক বা রাবারের কারখানা করার ক্ষেত্রে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর নতুন করে কোনো রাসায়নিক কারখানা বা গুদামের লাইসেন্স দেওয়া না হলেও আগের কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নেওয়া হলো না কেন? আর একই রকমভাবে দাহ্য প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা ও গুদাম বছরের পর বছর ধরে কোনো নিয়মনীতি ছাড়াই কীভাবে পুরান ঢাকার মতো বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় অবাধে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেÑএসব প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই খুঁজতে হবে।

নিমতলী ট্র্যাজেডিই হোক কিংবা নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন গার্মেন্টস ট্র্যাজেডিই হোক অথবা আজকের চকবাজার ট্র্যাজেডিÑ এ দেশে মানুষ কেবলই যেন ‘হতাহতের সংখ্যায়’ পরিণত হয়ে যায়। সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ হতাহতদের পরিবার-পরিজনের হাতে নামমাত্র ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করে, তদন্ত কমিটি হয়, কালেভদ্রে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কিন্তু এমন দুর্ঘটনা রোধের জন্য বাস্তবিক কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয় না।  সে রকম হলে নিমতলীর পর আজকের চকবাজারে এই দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়।  এখন প্রশ্ন হচ্ছে নিমতলী ও চুড়িহাট্টার ট্র্যাজেডি থেকে কী শিক্ষা নেব আমরা?

চকবাজারের মর্মান্তিক এই অগ্নিকাণ্ড ঢাকাবাসীর জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কসংকেত। এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এমন সব রাসায়নিক ও প্লাস্টিকপণ্যের গুদাম-কারখানা সরিয়ে নিতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কেরানীগঞ্জের প্রস্তাবিত ‘কেমিক্যালপল্লী’র পরিকল্পনা অচিরেই বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া কিংবা অন্য কোথাও এমন শিল্পের জন্য পরিকল্পিত ও সুরক্ষিত কোনো কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আমাদের এটা অনুধাবন করতে হবে যে, একটা রাজধানী কিংবা বড় নগরকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার করা এবং নতুন করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। আমরা এখনো সে লক্ষ্যে কঠোর হতে না পারলে ঐতিহাসিক এই ঢাকা নগরই এক অরক্ষিত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থেকে যাবে।