৯ বছর আগে নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের প্রাণহানির পর সরকার পুরান ঢাকা থেকে সব রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে কেরানীগঞ্জে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। সে উদ্যোগ নিয়ে এতদিন যেন শুধু ফাঁকা আওয়াজ দিয়েই তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। কেরানীগঞ্জে কেমিক্যাল শিল্পপল্লী নামের ওই প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্তের পর প্রস্তাব প্রস্তুত করতেই চলে যায় সাত বছর। এরপর গত ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনের আগে ‘জনতুষ্টির জন্য ঢালাওভাবে’ অনুমোদন দেওয়া প্রকল্পগুলোর সঙ্গে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। তবে তাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি কোনো টাকা। ফলে প্রকল্পটি একরকম কাগুজেই রয়ে গেছে। তাই পুরান ঢাকা থেকে কবে সরবে সব রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাÑ তা বলতে পারছেন না খোদ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সাইফুল আলমও। ২০১০ সালের জুনে নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় বাসিন্দারা পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নিতে আন্দোলন শুরু করে। চাপে পড়ে ওই বছরই রাসায়নিক কারখানাগুলো কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৮ সালে প্রকল্প প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। বরাদ্দহীন অন্য অনেক প্রকল্পের সঙ্গে ৩০ নভেম্বর অনুমোদন হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতাধীন প্রকল্পটি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পিডি সাইফুল আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাকে এই প্রকল্পের পিডি নিয়োগ দিয়ে আদেশ জারি হয়েছে গত ৩ জানুয়ারি। ৬ জানুয়ারি আমি যোগদান করেছি। প্রকল্পের কাজ বলতে শুধু মৌজা-ম্যাপ প্রণয়ন চলছে। এর বাইরে তেমন অগ্রগতি নেই। তিনি বলেন, অর্থ বরাদ্দ না থাকায় জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু করা যাচ্ছে না। জমি অধিগ্রহণের আগেও অনেক কাজ আছে। সেগুলো করার পর আগামী বাজেটে বরাদ্দ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসককে জমি অধিগ্রহণের টাকা দেব। নিয়মানুযায়ী জমি মালিকদের নোটিস দেওয়া হবে। প্রচলিত নিয়মে জমি অধিগ্রহণ করতেও অনেক সময় লাগে। আবার কেরানীগঞ্জে একসঙ্গে ৫০ একর জমি পাওয়াও খুব কঠিন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও সাবেক সচিবদের গাফিলতি আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নেই আট বছর লেগে গেছে। নিমতলীর ঘটনা মানুষের মনে চাপা পড়ার পর এ প্রকল্প প্রণয়নে তাদের আগ্রহও কমে যায়, যার চরম মূল্য দিতে হলো চকবাজারের অগ্নিকা-ে। প্রকল্প প্রস্তাব তৈরিতে এত বিলম্বের কারণ জানতে গতকাল বিকেল থেকে একাধিকবার সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমুর সঙ্গে কথা বলতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১১ সালে প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়ার পর পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানাগুলো সরিয়ে মুন্সীগঞ্জ নাকি কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবেÑ সে সিদ্ধান্ত নিতেই লেগে গেছে তিন বছর। পরে সব পক্ষের সম্মতিতে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও সেখানে একসঙ্গে ৫০ একর জমি কোথায় পাওয়া যাবে এই প্রশ্নে গেছে আরও চার বছর। ২০১৭ সালে প্রকল্প তৈরির কাজ শুরু হয়।
স্মরণকালের ভয়ানক ওই ঘটনার পর পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানাগুলো কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নিতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন হয়েছিল ২০১০ সালেই। সমন্বয়হীনতা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ওই কমিটি কার্যত কোনো কাজে আসেনি। নিমতলী ট্র্যাজেডির পর কিছুদিন পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরাতে অভিযান চললেও সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় সে উদ্যোগও। তারপর গত কয়েক বছর কোনো অভিযান চলেনি বলে দেশ রূপান্তরকে জানান চকবাজারের বাসিন্দা রহমত আলী। তিনি বলেন, কারও কোনো অভিযান নেই। নিমতলীর ঘটনার পর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস কিছুদিন অভিযান চালালেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখনো পুরান ঢাকা জুড়ে অনেক বিপজ্জনক রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে, দিব্যি চলছে অনেক কারখানা। সুরিটোলা, সিদ্দিকবাজার, চকবাজার, চানখাঁরপুল, নাজিমউদ্দিন রোড, আগামসি লেন, মালিটোলা, আরমানিটোলাসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এখনো পলিথিন, জুতা, প্লাস্টিক পণ্য, পিভিসি পাইপ, মশার কয়েলসহ নানা ধরনের কারখানা রয়েছে। যেগুলো তৈরিতে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক লাগে। চানখাঁরপুলের বাসিন্দা হাজি গণি মিয়া বলেন, অনেক বাড়ির নিচে এখনো রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম রয়েছে। বাড়িওয়ালারা বেশি টাকা পাওয়ার আশায় গোপনে কারখানার জন্য ভাড়া দিচ্ছেন। সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের কাছে যে এ প্রকল্পের গুরুত্ব কম, তা দেখা যায় বিসিকের ওয়েবসাইটেও। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পসমূহ’ নামে পাঁচটি প্রকল্পের তালিকা থাকলেও সেখানে জায়গা হয়নি কেমিক্যাল শিল্পপল্লী প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটির। সাধারণত জুন মাসে বাজেট প্রণয়নকালে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি সংশোধনকালে কোনো কোনো প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো-বাড়ানো হয়। পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের এ প্রকল্পটি নভেম্বরে পাস হওয়ায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ পায়নি। তবে এখনো সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চকবাজারে গত বুধবারের মর্মান্তিক ঘটনার পর গতকাল সকালেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে জরুরি সভায় বসেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। সভায় রাসায়নিক কারখানা কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নিতে এত দেরি হচ্ছে কেনÑ সেজন্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি। যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পে গতি আনার তাগিদও দেন। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে ডিসি অফিস, ভূমি মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিসিকের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন মন্ত্রী নূরুল মজিদ। প্রকল্পের পিডি অন্য জেলায় থাকায় তাকে দ্রুত ঢাকায় ফিরতে বলা হয়। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার পথে থাকা পিডি সাইফুল ইসলাম জানান, আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় শিল্প মন্ত্রণালয়ে এই প্রকল্প নিয়ে বৈঠক ডাকা হয়েছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে শিল্পমন্ত্রী বলেন, পুরান ঢাকায় অবস্থিত কেমিক্যাল কারখানা স্থানান্তরের জন্য কেরানীগঞ্জে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ৫০ একর জমির এ প্রকল্পে ৯৩৬টি প্লট থাকবে। প্রকল্পটি জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২১ সময়ে বাস্তবায়িত হবে; ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নে পিডি সাইফুল বলেন, ‘চকবাজারের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় যদি এখনই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাহলে এখন থেকেই প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করব। কাজ শুরু হলে তিন বছরের মধ্যেই পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সেখানে স্থানান্তর সম্ভব হবে।’