গণশুনানির সমাপনী বক্তব্যে ড. কামাল

৩০ ডিসেম্বরের প্রহসন প্রমাণ হয়েছে

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যাবে না। প্রমাণ হয়েছে এটা প্রহসন। গতকাল শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে দিনব্যাপী গণশুনানি শেষে সমাপনী বক্তব্যে প্রার্থীদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরতে গিয়ে এ কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে অবিলম্বে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানান ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসন প্রমাণ হয়েছে সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক জোট ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা।

সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শুনানি শেষে ড. কামাল হোসেন বলেন, এই নির্বাচনকে নির্বাচন বলা যাবে না। এটা তো নির্বাচন ছিল না, ছিল তথাকথিত নির্বাচন। এই শুনানিতে আমরা বুঝতে পেরেছি এটা (একাদশ সংসদ) কোনো নির্বাচন হয়নি। ৪২ জন প্রার্থীর কথা শোনার পর আমরা বলতে পারি এটাকে নির্বাচন বলা যায় না, এটাকে বলা যেতে পারে সরকার একটা প্রহসন করেছে, দেশের নাগরিকদের তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে, সংবিধান অমান্য করেছে, গণতন্ত্রের মূলনীতির প্রতি অবমাননা করেছে। তিনি বলেন, বক্তব্য রাখা অধিকাংশ প্রার্থী আন্তরিকভাবে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেছেন। তাই তার মুক্তি অত্যন্ত যুক্তিসংগত দাবি। খালেদা জিয়ার মুক্তি অবিলম্বে হওয়া উচিত। এই অনুষ্ঠান থেকে দাবিটা সরকার ও জনগণের কাছে যাওয়া দরকার। তাকে মুক্তি না দেওয়াটা দুঃখজনক। সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম এই সদস্য প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আপনারা মারা গেলে উত্তরসূরিরা আপনাদের নিয়ে লজ্জা পাবে। আপনারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখুন, কী দেখছেন। আপনারা সংবিধান অমান্য করছেন। তিনি বলেন, আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কীভাবে দেশের মালিকানা ফিরিয়ে আনতে পারি সেটা করতে হবে।

গণশুনানি পরিচালনা করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য আবদুস সালাম। মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিলÑ একাদশ জাতীয় সংসদের তথাকথিত নির্বাচনের ওপর গণশুনানি। বিচারক হিসেবে মঞ্চে ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, ড. নুরুল আমিন বেপারী, অ্যাডভোকেট ড. মহসিন রশীদ, সাবেক বিচারপতি আ ক ম আনিসুর রহমান খান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী।

সূচনা বক্তব্যে ড. কামাল বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে কারচুপি ও অনিয়ম হয়েছে তা বিচারের ক্ষমতা সরকারের নেই। তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গণশুনানি করছে। আমরা বিচারক নই। কোনো বিচার করার ক্ষমতা ও কর্তব্য আমাদের নেই। গণশুনানি হচ্ছে, প্রার্থীরা জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য রাখবেন। বিচার যেটা হচ্ছে সেটা ট্রাইব্যুনালে হবে। এরই মধ্যে প্রার্থীরা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। তিনি বলেন, গণআদালত যেটা বলা হয়, সেটার বিচারক জনগণ। আমরা এসেছি অনুষ্ঠানটা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য। প্রার্থীরা যে বক্তব্য রাখবেন সেগুলো পরে বই আকারে প্রকাশ করা হবে। সবার বক্তব্য রেকর্ড করা হবে।

সূচনা বক্তব্যে ফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ৩০ ডিসেম্বর দেশে একটি প্রহসনের নির্বাচন করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায়, যা ইচ্ছা তা-ই করছে সরকার। কোনো কিছুর জন্য জবাবদিহি করতে হচ্ছে না।

শুনানির শুরুতে পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পড়ে শোনান মির্জা ফখরুল। এরপর নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয় এবং উপস্থিত সবাই নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মোনাজাতে অংশ নেন।

প্রার্থীরা যা বললেন : শুনানির প্রথম বক্তা লালমনিরহাট-৩ আসনের প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ৩০ ডিসেম্বর কোনো নির্বাচন হয়নি, ভোট ডাকাতি হয়েছে। আমার এলাকায় সাতটি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট কাস্ট হয়েছে বলে বলা হয়েছে। দেখা গেছে, অনেক মৃত মানুষও ভোট দিয়েছে।

সিরাজগঞ্জের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী রুমানা মাহমুদ অভিযোগ করেন, তার প্রচার মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। গুলিতে তার কর্মী মেরী বেগমের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় মেরী বলেন, তাকে ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে, নয়তো চোখ ফেরত দিতে হবে।

যশোর-৩ আসনের প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সকাল ১০টার মধ্যে সব ব্যালট শেষ হয়ে যায়। এটা কিসের ভোট হয়েছে? প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোট ডাকাতি হয়েছে। জেলায় জেলায় গণআদালত বসিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

শেষ বক্তা গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, আমার কেন্দ্রে ইভিএম ছিল, যা সকাল থেকে নষ্ট ছিল। ভোট বন্ধ ছিল। তার মহিলা এজেন্ট সোনিয়া বলেন, আমি ভোটকেন্দ্রে গেলে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমি যখন বলি ঐক্যফ্রন্টের এজেন্ট তখন আমাকে মহিলা লীগ, যুবলীগের ছেলেরা শূন্যে উঠিয়ে ফেলে দেয়। এতে আমার গর্ভে থাকা সন্তান মারা যায়।

বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরী, জয়নুল আবদিন ফারুক তাদের বক্তব্যে দলের নেতাদেরও সমালোচনা করেন।