ভোক্তার সঙ্গে গোটা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ব্যাংক খাত। শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সর্বজনীন উদ্বেগের বিষয়। কাজের অংশ হিসেবে এই খাতের দুর্বলতাগুলো শনাক্ত করে তা সংশোধনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থার। এজন্য তাদের স্বাধীনতা ও নমনীয়তা দরকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা থেকে এ শিক্ষাই পেয়েছে বিশ্ব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রকদের নিজের মতো কাজ করতে দেওয়া উচিত। তারা গুরুত্ব দিয়েছেন নিয়ন্ত্রকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ওপর।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতা প্রায়ই নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংক বা রাজনৈতিক অভিসন্ধির কাছে নতিস্বীকারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় সবদিক সামাল দিতে গিয়ে সংকটের সময় অনেক নীতিনির্ধারক আদর্শচ্যুত হয়ে পড়েন। অর্থনৈতিক মন্দার পর থেকে ব্যাংকিং খাতে শীর্ষ অগ্রাধিকার বিষয় হয়ে উঠেছে পরিচালনাগত স্বাধীনতা। ২০১০ সালে এ খাতে উন্নত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। তাতে বৈশ্বিক আর্থিক প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড বলেছে, কার্যকর তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে সমালোচনার মুখে থাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা জরুরি।
কার্যকরভাবে ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলোতে ২০১২ সালে বেশি গুরুত্ব দেয় ব্যাসেল কমিটি অন ব্যাংকিং সুপারভিশন। তখন থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন মানদ- অনুযায়ী, পরিচালনাগত স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, সুশাসন, আইনগত সুরক্ষা ও আয়-ব্যয় সংক্রান্ত সুব্যবস্থার মতো বিষয়ে জোর দিতে হয় নিয়ন্ত্রকদের। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ হবে সব তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সহযোগিতা করা। তবে ব্যাসেলের মূল নীতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় সব দেশের বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পর্যাপ্ত তথ্য দেয় না। পরিচালনগত স্বাধীনতার দিক দিয়ে এখনো বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই দুর্বল। অপর্যাপ্ত জনবল ও আয়-ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যের অভাব কোনো দেশের অর্থনীতিতে বহিরাগতদের প্রভাব ও চাপ বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে শুধু উদীয়মান অর্থনীতিই নয়; উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ আর্থিক খাত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তে সরকারের হস্তক্ষেপের আশঙ্কার চিত্র উঠে আসে। যেসব দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রভাবশালী, সেখানে বিবেচনাপূর্ণ সিদ্ধান্তে সততা বজায় রাখা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রকদের পরিচালনগত স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অবশ্যই অসীম নয়। তাদের যে কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জন্য জবাবদিহি করতে হবে। রাজনীতিবিদ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচিত ব্যাংক নিয়ন্ত্রকদের তাদের কাজ করতে দেওয়া। নিয়ন্ত্রকদের আর্থিক প্রক্রিয়া নিরাপদ ও ইতিবাচক রাখতে পর্যাপ্ত তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত ও দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া উচিত। নির্দিষ্ট খাতের উন্নয়নে যে কোনো দেশের নীতিনির্ধারকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে নীতিনির্ধারকদের এমন কোনো কিছু করা উচিত নয়। ব্যাংকিং খাতে নিয়ন্ত্রকদের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে দেওয়া সহজ। তবে ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। মাঝখানের এই সময়ে ঝুঁকিতে পড়তে পারে কোনো দেশের অর্থ ব্যবস্থা। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিলুপ্ত বা দুর্বল হয়ে যে কোনো জাতিকে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়তে হতে পারে। তাই নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সচেতনতার সঙ্গে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।
(তবিয়াস আদ্রিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার (এমসিএম) বিভাগের পরিচালক। আদিত্য নারাইন ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার সাবেক কর্মকর্তা ও আইএমএফের এমসিএমের উপপরিচালক। ভাষান্তর : টুসি বোস