পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে কারণ হিসেবে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা উল্লেখ করা হয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। স্থানীয় রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবসায়ীদের অনেকে এখনো এমন দাবি করছেন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনো আলামত পাননি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের আলামত পায়নি পুলিশ তারা। আগুনের কারণ জানতে গত শনিবার পুরান ঢাকার কিছু ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দেশ রূপান্তর। তাদের একজন রাসায়নিক ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বাবু। তিনি বলেন, ‘আর লেইখেন না কেমিক্যাল নিয়া। আগুন লাগছে সিলিন্ডার থিকা। এইটা বেশি বেশি কইরা লেখেন। বড় বড় শিল্পপতিরা সিলিন্ডারের ব্যবসা করার জন্যই খালি কেমিক্যালের ওপর দোষ চাপাইতাছে।’
বাবু আরও বলেন, ‘প্রথমে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হইছে। তারপর সেখান থিক্যা আগুন ট্রান্সফরমারে গিয়া ছড়াইছে। তারপরে কেমিক্যাল সেই আগুনের মাত্রা বাড়াইছে।’ কথা বলার সময় বাবুর পাশে থাকা শাওন ও হিরু নামের স্থানীয় দুই বাসিন্দা আরেক ‘প্রত্যক্ষদর্শী’কে দেখিয়ে বলতে থাকেন, ‘ওই যে উনার ইন্টারভিউ নেন। উনি আগুন থেইক্যা বাঁইচা আইছেন।’
তাদের দেখানো ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে চুড়িহাট্টা মোড়ের পান-সিগারেট ব্যবসায়ী বলে দাবি করেন। নাম বলেন মিন্টু সরদার। আগুনের কারণ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে একটা সিএনজি ধাক্কা মারে প্রাইভেটকারে। প্রাইভেটকার গিয়া লাগে পিকআপের লগে। তারপর পিকআপে থাকা গ্যাসের সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে এক্কেবারে উপরের দিকে উইঠা যায়। তারপরই আমি দোকান ছাইড়া দৌড়ায়া পালাই।’
মিন্টু সরদারের এমন বর্ণনায় উপস্থিত শাওন ও বাবু এবার প্রতিবেদককে বলতে থাকেন, ‘এবার বুজেন! আগুন লাগল কেমতে?’
চুড়িহাট্টা চৌরাস্তায় স্থানীয়দের ওই জটলা থেকে বেরিয়ে নন্দকুমার দত্ত রোডে পৌঁছামাত্র স্থানীয় একজন ব্যক্তি পেছন দিক থেকে ঘাড়ে হাত দিয়ে থামিয়ে বলেন, ‘ভাই! মিন্টুকে আমি চিনি। আপনাকে পুরাই মিথ্যা বলেছে। আসলে ও কুলি। ব্যবসায়ীদের মালামাল টানে। আগুনের সময় ঘটনাস্থলেই ছিল না।’ তার কথা শুনে আবার মিন্টু সরদারের কাছে মিথ্যা বলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সব কাজই করি। আগুনের সময় পাশেই আছিলাম।’ এই বলেই হনহন করে মিলিয়ে যান ব্যবসায়ীদের ভিড়ে।
গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণেই আগুনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করছেন বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এম এস আই হাবিব। তিনি বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কোনোভাবেই কেমিক্যাল বা কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ওটা ছিল কেবলমাত্র গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ফল।’
তবে ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডস্থলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনো আলামত খুঁজে পায়নি তদন্তকারী পুলিশ। এ বিষয়ে আজ (গতকাল রবিবার) সঠিক তথ্য জানার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি একটি সিরিয়াস ঘটনা। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষ হলেই জানতে পারবেন।’
অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে লালবাগ জোনের জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডস্থলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনো আলামত খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার কেমিক্যাল গোডাউন থেকেই বিস্ফোরণের তথ্য পেয়েছেন। এ বিষয়ে গতকালই ফায়ার সার্ভিসের মতামত জানতে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের বিবরণ দিতে গিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের পর সিসিটিভির একাধিক ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর বাইরে ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার রাসায়নিক বিস্ফোরণেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন রাসায়নিক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘কয়েকদিন ধরেই ওয়াহেদ ম্যানশনের আশপাশে রাসায়নিকের উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তার মানে ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার ফ্লোরে সংরক্ষিত কোনো রাসায়নিক লিকেজের মাধ্যমে বের হয়ে ফ্লোরটি একটি ‘গ্যাস চেম্বারে’ পরিণত হয়েছিল। আগুনের কোনো স্পার্ক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। বাতাসে যেভাবে আগুনের প্রবাহ দেখা গেছে তাতে নিশ্চিত ওখানকার বাতাসও রাসায়নিকের গ্যাসে ঠাসা ছিল।’