পিলখানা ট্র্যাজেডির ১০ বছর

বিস্ফোরক মামলায় আটকা ৫০০ আসামির মুক্তি

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় খালাস ও সাজা খাটা প্রায় ৫০০ আসামির মুক্তি মিলছে না। হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে তাদের সাজার মেয়াদ শেষ হলেও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে করা অপর মামলায় হাজতি হিসেবে কারাগারে আছেন তারা।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) ও বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তরে হত্যা করা হয় ৫৭ সামরিক কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে। আজ সোমবার সেই বহুল আলোচিত পিলখানা ট্র্যাজেডির ১০ বছর। সেদিন সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের নির্মমভাবে নির্যাতন ও গুলি করে হত্যা করা হয়। ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করা হয় সেনা কর্মকর্তাদের বাসা-বাড়িতে। সে ঘটনায় আলাদা তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে একটি বিদ্রোহের মামলা। এর বিচার হয় তৎকালীন বিডিআরের নিজস্ব আইনে। হত্যা মামলায় তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত  বিভাগ (সিআইডি)। ২০১৩ সালে বিচারিক আদালতের রায়ে ৮৩৪ আসামির মধ্যে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের নথি) হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্তরা হাইকোর্টে আপিল করেন। 

বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচারকাজ চলছে রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত বিশেষ আদালতে। আসামিপক্ষের একাধিক আইনজীবী জানান, হাইকোর্টের রায় ঘোষণার পর আপিলের জন্য তারা পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় আছেন। হাইকোর্টের রায়ের এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। এখনো হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় হয়নি। অপরদিকে বিস্ফোরক আইনের মামলার বিচারকাজ চলছে ধীরগতিতে। ওই মামলায় ১ হাজার ২০০ সাক্ষীর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭৮ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার আসামি সংখ্যা ও দণ্ড বিবেচনায় হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হতে একটু সময় লাগছে।’ ওই সময় বিস্ফোরক আইনের মামলার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর পিলখানা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। নি¤œ আদালতে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে হাইকোর্টের রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে। এ ছাড়া ৩ থেকে ১০ বছরের সাজা হয় ২২৮ জনের।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নি¤œ আদালতে খালাস পাওয়া ২৮৮ জন ও হাইকোর্টে ৩ থেকে ১০ বছরের সাজা হওয়া ২২৮ আসামির সাজার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই ৫১৬ জনের বিস্ফোরক মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় মুক্তি পাচ্ছেন না তারা। বিচারে আসামিদের যা-ই সাজা হয় হোক, আমরা চাই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হোক।’    

আসামিপক্ষের আইনজীবী শামীম সরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিলখানা হত্যা মামলায় প্রথমে বিচারিক আদালত এবং পরে হাইকোর্টে রায় হলেও বিস্ফোরক আইনের মামলায় এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। কবে নাগাদ এটি শেষ হবে তা বলা মুশকিল।’ তিনি বলেন, ‘হত্যা মামলায় যারা খালাস পেয়েছিলেন তাদের অনেকেই বিস্ফোরক মামলাতেও আসামি। এর ফলে তারা একটি মামলায় খালাস পেলেও বিস্ফোরক মামলায় দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন।’

গ্রেপ্তার হয়নি ২২ জন : পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর পলাতক ২২ সদস্য গ্রেপ্তার হয়নি। এদের ধরিয়ে দিতে ২ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে সরকার। তারপরও তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। গ্রেপ্তারের জন্য ‘অপারেশন র‌্যাবল হান্ট’ নামে অভিযানও চালানো হয়েছে। পলাতকদের মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সে এই ১৪ জনের আপিল হয়নি। বিজিবির এক কর্মকর্তা জানান, পলাতক ২২ বিডিআর সদস্যকে গ্রেপ্তারে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

কর্মসূচি : পিলখানার শহীদদের স্মরণে আজ ওই স্থানে শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হবে। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী শহীদদের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে বিজিবির সব দপ্তরে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় আজ সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধানরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব এবং বিজিবি মহাপরিচালক শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক দেবেন। আগামীকাল মঙ্গলবার বাদ আসর পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।