২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা। সারা ঢাকা শহর প্রস্তুত মহান ভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরের, ঠিক তখন ব্যস্ত চকবাজারে যানজটের মাঝে গ্যাস সিলিন্ডারভর্তি একটি পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশার ধাক্কায় সিলিন্ডারগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। চারিদিকে প্রাইভেট কার, পিকআপ ভ্যান, মোটরসাইকেল, রিকশার ছোটাছুটির মাঝে আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকে। আগুন লাগে পাশর্^বর্তী দোকানপাট, বসতবাড়িতে। চকবাজারের অসংখ্য রাসায়নিক কারখানা ও গুদামের দাহ্য পদার্থে অগ্নিকা- দ্রুত ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। চকবাজারের কেমিক্যাল গুদামে রাখা বডি-স্প্রে ও এয়ার ফ্রেশনারের বোতল একের পর এক বিস্ফোরিত হতে থাকলে পাশের ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যায়। পুড়ে অঙ্গার হলো ৭৯টি তরতাজা প্রাণ। গুরুতর আহত ৪১ জন। সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া পাঁচটি ভবনের একটি ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টে ছিল ড্রাম ও বস্তাভর্তি ১১ ধরনের কেমিক্যালের মজুদ। এ গুলোতে আগুন ধরলে পরিস্থিতি আরও ভয়াহত হতে পারত। সরু অলিগলিতে অগ্নিনির্বাপক দলের প্রবেশে সমস্যা ও নিকটবর্তী জলাধারের অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়।
নয় বছর আগে ২০১০ সালের ৩ জুন ঠিক একইভাবে পুরান ঢাকার নিমতলীতে কতিপয় লোভী ও অপরিণামদর্শী মানুষের অসচেতনতার কারণে ১২৪ জন মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা প্লাস্টিক ও পলিথিন কারখানা, রাসায়নিক গুদামে দাহ্য পদার্থ মজুদের পরিণতি যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, নিমতলী আর সাম্প্রতিক চকবাজার ট্র্যাজেডি এর জ্বলন্ত প্রমাণ। ফায়ার সার্ভিসের হিসাবমতে, বিগত দিনে পুরনো ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনে অন্তত দুই শতাধিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। নিমতলী আর চকবাজারের মতো পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মার্কেটে গোডাউনের অনেকগুলোতেই ড্রামভর্তি রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ রয়েছে। এমনকি অনেক বাড়ির মালিক বেশি ভাড়ার লোভে বাসার নিচতলায় এ ধরনের রাসায়নিক পদার্থ মজুদের জন্য ভাড়া দেন।
নিমতলী ট্র্যাজেডির পর সরকার গঠিত টাস্কফোর্সের তালিকায় থিনার-বি, থিনার-সি, এসিটেট, ইথানল, ইথাইল এসিটেট, টলুইন, প্রোপাইলিন অ্যালকোহল, প্রোপাইলিন গাইকলসহ ২০টি দাহ্য পদার্থকে চিহ্নিত করে। ঘিঞ্জি গলির ভেতরে অবস্থিত কারখানায় ড্রামভর্তি মজুদ জুতার কারখানায় সোল পেস্টিংয়ের কাজে ব্যবহৃত দাহ্য পদার্থে যেকোনো সময়ে অগ্নিকা- ঘটতে পারে। চকবাজারের বিভিন্ন রাসায়নিক কারখানার শত শত গুদামে রয়েছে নানা রকম বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থের মজুদ। বিশেষজ্ঞের মতে, এর মধ্যে বেশকিছু কেমিক্যালের একটি ড্রাম এক হাজার বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী, যা থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে পুরান ঢাকার অধিকাংশ জায়গাই পুড়ে যেতে পারে।
২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সময় বেঁধে সরকার ব্যবসায়ীদের সব রাসায়নিক দোকান ও গুদাম অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেও এ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০১১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে ৮০০টি রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে একটি টেকনিক্যাল কমিটিও গঠন করা হয়। ২০১৪ সালের মধ্যে কেরানীগঞ্জে ২০ একর জমির ওপর রাসায়নিক পল্লী স্থাপনের সিদ্ধান্ত হলেও তা বাস্তব রূপ নেয়নি। এ পল্লীতে ১৭টি ভবনে ১০৭৯টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঝুঁকিমুক্তভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার কথা ছিল। পুরান ঢাকার সকল রাসায়নিক কারখানা, গুদাম ও দোকান উচ্ছেদ এবং সকল প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য উৎপাদন, বিপণন, গুদামজাতকরণ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিমালা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য শহরতলিতে পৃথক শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী লাল, হলুদ বিপদ সংকেতযুক্ত সাইনবোর্ড প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করাসহ হোল্ডিংয়ে লোকজন বসবাস নিষিদ্ধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।
চকবাজারের অগ্নিকান্ডের পর ডিএসসিসির তদন্ত কমিটি আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে মজুদকৃত কেমিক্যালকে দায়ী করেছে। পুরান ঢাকার জনগণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেখানকার সব কেমিক্যালের দোকান, গুদাম ও কারখানা অন্যত্র স্থানান্তরের দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি নিরাপদ যেকোনো স্থানে রাসায়নিক দ্রব্য মজুদকারীদের জন্য ফায়ার লাইসেন্স গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেকোনো ধরনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা দ্রুত মোকাবিলার জন্য বুড়িগঙ্গার পানি তুলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে পুরান ঢাকার সরু অলিগলিতে ফায়ার-হাইড্রেন্ট বসানো যেতে পারে। পুরান ঢাকার অগ্নিকান্ডের ঝুঁকি মোকাবিলায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে জোরদার করতে ডিডিসি, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট মহলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাফল্যকে অগ্নিনির্বাপণের কাজে লাগানোর উদ্দেশে আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি দিয়ে দক্ষ জনবল কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে ফায়ার সার্ভিসকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ প্রতিটি পাড়া, মহল্লায় স্থানীয়ভাবে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জনগণের মাঝে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যাবশ্যক।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক