অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই এক। একটি দেশ যখন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্পায়নের দিকে রূপ নেয় তখন হালকা উৎপাদনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে সেই যাত্রা শুরু হয়। পরে সেই উন্নয়ন টেক্সটাইলের মতো ভারী শিল্পে উন্নীত হয়। উন্নয়নের কোনো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি দেশ যাচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে এক সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও এর মডেল নিয়ে সম্প্রতি ব্লুমবার্গ সংবাদমাধ্যমে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়, উন্নয়নের এই প্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী। দেশটির রপ্তানি রাজস্বের ৮০ শতাংশের বেশি আসে গার্মেন্ট শিল্প থেকে। ২০১৭ সালে চীনের পর বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পোশাক সরবরাহকারী দেশ। প্রতিবেশী বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ভারত এই রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য হলেও দেশটির থেকে এগিয়ে বাংলাদেশ।
কিন্তু বাংলাদেশকে এই উন্নয়নে অনেক কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। বাংলাদেশের শ্রমিকরা বাজে শ্রম পরিবেশ এবং দুর্ঘটনার মধ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এত কিছুর পরেও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হয়েছে শিল্পায়নে ভারতের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতিও ঊধ্বমুখী।
উৎপাদনমুখী বাণিজ্যে বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের অবস্থান কিছুটা নি¤œমুখী। যদিও ভারতই বিশ্বের ষষ্ঠ অটো প্রস্তুতকারক দেশ এবং স্মার্টফোন নির্মাতা। কিন্তু অর্থনীতির হিসেবে দেশটির উৎপাদনমুখী প্রবণতা কম। এর মানে এই নয় যে ভারতের নেতারা উৎপাদনবিমুখ। প্রকৃতপক্ষে তারা অনেকদিন ধরেই দেশের উদ্যোক্তাদের উৎপাদনমুখী করার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিদেশি উৎপাদকদের ভারতে ডেকে আনছেন, কিন্তু এর প্রভাব অনেক সীমিত। অধিকাংশ পর্যবেক্ষকরা সম্মত হবেন যে, অবকাঠামো স্বল্পতা এবং কঠোর বাণিজ্যিক নীতিমালার কারণে দেশটিতে উৎপাদনমুখী প্রবণতার বিকাশ হচ্ছে না।
কিন্তু ভারত তাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন এক মডেল প্রয়োগ করছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। সফটওয়্যার, অর্থায়ন, অনলাইন সেবা, পর্যটন, মিডিয়া, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে আউটসোর্সিংয়ের কারণে ভারতের অর্থনীতির অগ্রগতি বেড়েছে। অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করেন, ভারত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে এক লাফে শিল্পায়ন পরবর্তী অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে।
এসব বিবেচনায় একটি প্রশ্ন দাঁড়ায়, বাংলাদেশ কি প্রচলিত মডেল অনুসরণ করেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং ভারতকে অতিক্রম করবে? উন্নত প্রযুক্তির এই সময়ে প্রচলিত মডেল অনুসারে দরিদ্রতা থেকে বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একটি দরিদ্র দেশ আর চাইলেও গার্মেন্টশিল্পে গণকর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে না। উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশে ওই শিল্প চলে যেতে পারে, যেখানে শ্রম বেশ চড়ামূল্যের কিন্তু মূলধন অপেক্ষাকৃত সস্তা। এরই মধ্যে এমন উল্টো পরিস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে ঘটছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিল্পায়ন পূর্ণতা পাওয়ার আগেই পিছিয়ে যাচ্ছে। ধনী দেশগুলোর রোবটের প্রতিযোগিতা থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে গেলে ইথিওপিয়ার মতো দেশে পরিণত হবে। আর এক্ষেত্রে ভারতের সেবাকেন্দ্রিক উন্নয়ন মডেল একমাত্র সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কিছু অর্থনীতিবিদ যুক্তি দিয়ে বলেন, অটোমেশন প্রচলিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেলের মধ্যে পড়ে না এবং গরিব দেশগুলোতে এখনো এই শিল্পে অনেক মানুষের কাজ করার সুযোগ আছে। বাংলাদেশেও অটো এবং ইলেকট্রনিকের মতো উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের নেতাদের অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য এক কিন্তু তাদের মডেল ভিন্ন। আফ্রিকার অনেক দেশ দক্ষিণ এশিয়ার এই দুটি দেশকে অনুসরণ করছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি বেড়ে গেলে অন্তত এটা বোঝা যাবে যে, টেক্সটাইলসের মতো উৎপাদনমুখী শিল্প শিল্পায়নের টিকিট হতে পারে।