যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে সে সরকারের পক্ষে সরকারি লোকেরা থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। এই নির্বাচনেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রশাসন তৎপর ছিল সরকারি দলের যাতে কোনো অসুবিধা না ঘটে, সেটা দেখতে। চাকরি ঠিক রাখার ব্যাপার আছে, চাকরিতে প্রমোশনের আশা রয়েছে। কেবল যে কর্মরত কর্মকর্তা তা নয়, আমলাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত অসামরিক ও সামরিক বড় বড় কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনে তার সাফল্য কামনাও করেছেন। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারকে সমর্থন করবে এতে অস্বাভাবিকতা নেই, কিন্তু তারা যদি সরকারি দলের দলীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে তাহলে সেটা যে নাগরিকদের স্বার্থ ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য শুভসংবাদ হবে না এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যবসায়ীরা সভা করে জানিয়েছেন যে তারা চান বর্তমান সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যাতে অক্ষণ্ন থাকে।
বলাবাহুল্য ওই উন্নয়নে তারা অংশীদার, তাদের কারও কারও উন্নতির দ্রুতগামিতা সারা বিশ্বে চমকের সৃষ্টি করেছে। এত গরিব দেশে তাদের এত সম্পদ! কিন্তু সে সম্পদ তারা দেশে রাখছেন না, পাচার করে দিচ্ছেন বিদেশে। বাংলার সম্পদ এক সময় দিল্লিতে চলে গেছে, তারপর গেছে লন্ডনে, পিন্ডিতে যাচ্ছিল অনেক কষ্টে থামিয়েছি; এখন যাচ্ছে বিভিন্ন ঠিকানাতে; সিঙ্গাপুরেও। সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন রয়েছে। হাতে আছে টাকা, লোক আছে টাকা ঢালবার; কাজেই নির্বাচনী প্রচার একতরফা উঠেছিল তুঙ্গে। বিরোধী পক্ষ আগের মতোই কাবু হয়ে ছিল হামলায়, মামলায়, গ্রেপ্তারে; তাদের প্রার্থিতাও বাতিল হয়েছে অনেকের। মাঠ সমান হবে কি, বাস্তবিক পক্ষে কোথাও কোথাও হয়তো মাঠ খালিই রয়ে গেছে।
টাকা যা খরচ হয়েছে তার অনেকটাই গেছে বেকার যুবকদের হাতে। এদের লুম্পেন বলা হয়। এরা দলের ভক্ত নয়, টাকার ভক্ত। বাংলাদেশে উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু কর্মের সংস্থান বাড়ছে না; মেহনতিদের শ্রমের ওপর নির্ভর-করা উন্নতি কর্মহীনতা কমাচ্ছে না, বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে বেকার সমস্যার ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি, আতঙ্কগ্রস্ত করার কথা দেশের শাসক শ্রেণিকে, কারণ এই সমস্যা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করছে; নির্বাচন উপলক্ষে লুম্পেনরা হাতে নগদ টাকা পেয়েছে, উৎফুল্ল হয়েছে, কিন্তু নির্বাচন শেষে এরা যখন দেখছে টাকার উৎস শুকিয়ে গেছে, তখন টাকার জন্য তারা নানা রকমের অপরাধে লিপ্ত হবে। ফলে মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়বে, খুন-জখম-ধর্ষণ এখনই ভয়াবহ, আগামীতে তা যে আরও বাড়বে; এমনটা না-ভাবার কোনো কারণ নেই।
ইসলামপন্থি দলগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী পুরনো পাপী, তাদের নৃশংসতার খবর আমরা রাখি; কিন্তু হেফাজতপন্থিরা যে-ভাবে কদম কদম এগিয়ে যাচ্ছে, আবার প্রশ্রয়ও পাচ্ছে তাও কম বিপজ্জনক নয়। হেফাজতপন্থিরা নির্বাচনে আসবে না, তারা তলোয়ার নিয়ে রাস্তায় নামবে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সময়ে তাদের নৃশংসতার কিছু নমুনা ঢাকাবাসী পেয়ে গেছে। তাদের দাবিগুলোর কয়েকটির ভয়াবহতা অতুলনীয়; যেমন ধর্মদ্রোহিতা আইন চালুর দাবি। এই আইন পাকিস্তানে চালু হয়েছে; ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে এটা চালু করবার দাবি কেউ কখনো তুলতে পারবে এটা ছিল কল্পনার বাইরে! কিন্তু হেফাজত সে-দাবি ঠিকই তুলেছে। এরই মধ্যে তাদের ছাড় দেওয়া হয়েছে; তাদের দাবি অনুযায়ী বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তকে উদ্ভট সব পরিবর্তন আনা হয়েছে (তারা অবশ্য ইংরেজি মাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ করেনি; ওই মাধ্যম তাদের নাগালের বাইরে।) তাদের-দেওয়া শিক্ষা-সনদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমমর্যাদা দানের সরকারি সিদ্ধান্ত এরমধ্যেই গৃহীত হয়ে গেছে। শোনা যায় বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিমূল্যবান কিছু জমিতেও তারা স্থায়ী দখলদারিত্ব কায়েম করে ফেলেছে, সরকার বাধা দিচ্ছে না। কওমি মাদ্রাসার ধারা থেকে হাজারে হাজারে মানুষ বের হয়ে আসছে; করবার মতো কাজ পাচ্ছে না; ফলে লুম্পেনদের বর্ধিষ্ণু বাহিনীতে আগামীতে এরাও যোগ দেবে, ওই বাহিনীর স্ফীতি ঘটাবে। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা এখন তেমন শোনা যায় না, আগামীতে হয়তো অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলাও কষ্টকর হবে।
এই সব সম্ভাবনা যে মোটেই সুসংবাদ নয় সেটা বুঝতে কোনো কষ্ট নেই। সবচেয়ে ভালো ভাবে বোঝে দেশের ধনীরা। তারা তাই তাদের ভবিষ্যৎ দেশে না গড়ে বিদেশে গড়ে তুলছে। দেশে তারা কওমি মাদ্রাসার জন্য টাকা ঢালে, কিন্তু নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠায়, যে-বিদেশ থেকে ওই তরুণরা আর কখনো ফিরবে না। না-ফিরুক ক্ষতি নেই, কিন্তু তারা যে দেশের মানুষের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তার কী হবে? নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায় সেটা দেশের ভেতরে থেকে না-দেখে নিরাপদে বাইরে বসে দেখার জন্য নির্বাচনের পূর্বে অনেকে বিদেশে চলে গেছে বলে জানা গেছে। এয়ার লাইনের টিকিট সংকট দেখা দিয়েছে। টিকিট বিক্রি হয়েছে তিন-চার গুণ বেশি দামে (বণিক বার্তা, ২৫ ডিসেম্বর)।
তা ধনীরা না হয় বেশি দামে হলেও বিদেশে যেতে পারবে, কেউ কেউ চলে গেছেও, কিন্তু বাদবাকিরা? তাদের তো দেশেই থাকতে হয়েছে, এবং বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সে বাস্তবতা মোটেই আনন্দদায়ক হয়নি। মূল কথাটা হচ্ছে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। ব্যক্তিমালিকানা থেকে সামাজিক মালিকানায় যাওয়া। সে কাজটা করার নেতৃত্ব দিতে হবে দেশের বামপন্থিদেরই। কিন্তু মুশকিল হলো বামপন্থিরা শক্তিশালী নয়। তাদের শক্তিশালী হতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকার তাদের পছন্দ করে না। আর মিডিয়া তো পুরোপুরিই তাদের বিপক্ষে; তার কারণ হলো মিডিয়ার মালিকেরা সবাই ব্যক্তিমালিকানার পক্ষে।
ইসলামপন্থি দলগুলো যে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্রয় পাচ্ছে, এবং সামাজিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে তার প্রধান কারণ কিন্তু এই যে, ধনীদের মতো এরাও, ধনী-গরিব নির্বিশেষে, ব্যক্তিমালিকানায় বিশ্বাসী। আগামী দিনে দেশে নৌকাই
থাকবে, অন্যদের তেমন একটা দেখা যাবে না, এটা অনেকের ধারণা। কিন্তু ধানের শীষ যে-ভাবে কোণঠাসা হয়েছে তাতে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সে কতটা সংগঠিত হতে পারবে বলা মুশকিল। সংগঠিত হতে যদি না-পারে তাহলে নৌকার প্রতিদ্বন্দ্বী কে হবে? বামপন্থিরা যে হতে পারছে না তা বোঝা যায়, বুর্জোয়ারা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেও চাইবে না। সেক্ষেত্রে ইসলামপন্থি দলগুলোই হয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দেবে। সেটা যে ভালো কোনো ব্যাপার হবে না তার প্রমাণ মার্কিন আধিপত্যে বিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশকে আমরা নিশ্চয়ই মধ্যপ্রাচ্য করতে চাইব না।
দেশের ভবিষ্যৎ যে বামপন্থিদের শক্তির বিকাশের ওপরই নির্ভরশীল সেই সত্যটা ক্রমশ পরিষ্কার হচ্ছে; এই নির্বাচন তাকে আরও পরিষ্কার করে দিয়েছে। ভালো খবর বলতে ওই একটাই। দেশে এখন কেবল অপরাধ নয়, বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারাটা তো একটা বিরল সৌভাগ্য, কিন্তু তার ছাত্ররাও আত্মহত্যা করছে। হতাশায়। ভারতে প্রতি বছর বহু কৃষক আত্মহত্যা করে থাকে, ওই একই কারণে, হতাশায়। ভারতের কৃষকরা এ বছর দিল্লিতে গেছে, মার্চ করে; শোনা যায় তাতে হতাশা কমেছে, আশা করা যায়, আত্মহত্যার সংখ্যাও কমে আসবে। হতাশা থেকে বের হয়ে আসার প্রকৃষ্ট পন্থা ওইটাই, সমবেত হওয়া, সংঘবদ্ধ হওয়া, ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।