চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভস্মীভূত যানবাহনের খ-িত অংশ। এসব ভবনের সামনের অংশ ছেয়ে গেছে শোকের ব্যানারে। ঘটনার ছয় দিন পর গতকাল মঙ্গলবার পুরান ঢাকার চকবাজারের ওই এলাকায় গিয়ে আরও দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত দোকান ও ভবন মালিকদের তথ্য সংগ্রহ করছেন কেউ কেউ। আবার কেউ ব্যস্ত অগ্নিকাণ্ডের কারণের আলামত সংগ্রহে। সেখানে এক নারী খুঁজছিলেন সেদিনের সেই আগুনের নদীতে হারিয়ে যাওয়া স্বামীকে। চুড়িহাট্টার চৌরাস্তায় এমন পরিবেশের মাঝেই মসজিদ-সংলগ্ন গলিতে দেখা গেল কয়েকটি দোকান খোলা। সেসব দোকানে বেচাকেনা হচ্ছে কেমিক্যাল, যে কেমিক্যাল ২০ ফেব্রুয়ারির ওই আগুন ভয়ানক আকারে ছড়িয়ে পড়তে ভূমিকা রেখেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চুড়িহাট্টা চৌরাস্তার পাঁচটি ভবন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াহেদ ম্যানশনসহ তিনটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে ফায়ার সার্ভিস। ঝলসানো ওয়াহেদ ম্যানশনের উল্টো পাশে শাহী মসজিদ। মসজিদের পাশের গলির ১০ গজ দূরে যেতেই চোখে পড়ল ৮-১০টি দোকান খোলা; চলছে কেমিক্যাল বেচাকেনা। কোনো কোনো দোকানে ক্রেতাদের ছিল বেশ ভিড়। কোনো কোনো দোকানে ক্রেতা ছিল না; তবে নানা রঙের কেমিক্যালের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন বিক্রেতারা। এ সময় আশপাশের গোডাউন থেকেও এসব দোকানে আসছিল বস্তা বস্তা কেমিক্যাল।
এসব দোকানের একটি সেই খান প্লাস্টিক, যে দোকানের মালিক শরীয়তপুরের ইয়াসিন খান পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন। তার পাশের দোকানে ঢুকে দেখা গেল, মালিক হাজি মো. আবদুর রহিম নানা রঙের প্লাস্টিক দানার পসরা সাজিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করছেন দরদাম নিয়ে। অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলতেই দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, আমার পাশের দোকান মালিক ইয়াসিন খান আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। আমি দোকান ফেলেই দৌড়ে কোনোরকমে প্রাণে বেঁচেছি। এত তাড়াতাড়ি দোকান খোলার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এভাবে আর কতদিন বসে থাকব? এই ব্যবসা দিয়েই তো সবকিছু চলে। আবদুর রহিমের দাবি, তার দোকানে কোনো দাহ্য কেমিক্যাল নেই, যা আছে সবই প্লাস্টিকের দানা। এতে আগুন লাগালেও জ্বলবে না। এই দানা দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের কারখানায় প্লাস্টিক পণ্য তৈরি করে।গলির দুপাশে আরও অন্তত সাতটি দোকান খোলা ছিল এদিন, সেসব দোকানের বেশিরভাগে ছিল বস্তাবন্দি পণ্য। ভেতরে কেমিক্যাল কি না জানতে চাইলে তারা দাবি করেন, সবই প্লাস্টিকের দানা। তবে বস্তা খুলে দেখাতে রাজি হননি কেউই।
প্লাস্টিক দানার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসির আরাফাত খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্লাস্টিকের দানা অবশ্যই রাসায়নিক। একে বলা হয়ে থাকে পেট্রো কেমিক্যাল। এই কেমিক্যালও বেশি পরিমাণে কোনো দোকানে মজুদ রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। চুড়িহাট্টার ভয়াবহ আগুনের নেপথ্যে দাহ্য রাসায়নিকের পাশাপাশি এ ধরনের কেমিক্যালেরও ভূমিকা ছিল। তিনি আরও বলেন, বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য অগ্নিকাণ্ডস্থল থেকে কয়েক দফায় আলামত সংগ্রহ করেছি। সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায় মজুদ বডি স্প্রেতে ব্যবহৃত দাহ্য কেমিক্যালেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
তবে তার মতের সঙ্গে একমত নন স্থানীয়দের কেউ কেউ। তারা বলেন, আগুন নিচ থেকেই শুরু হয়ে দ্বিতীয় তলার ওয়াহেদ ম্যানশনে লেগেছিল। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আশরাফউদ্দিন স্বাধীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমি নিজে ভিডিও করেছি। আমি দেখেছি, আগুন প্রথমে নিচের দিকে থেকে ছড়িয়েছে। তারপর ওপরের দিকে গেছে। তবে নিচে কিসের থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত রাজমহল হোটেলের মালিক আলমগীর শিকদার বলেন, আমি তখন ক্যাশে বসেছিলাম। হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো একটা প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পাই। এর কিছুক্ষণ পর আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ে। তারপর আরও টানা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা বলেন, আগুন লেগেছে ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলা থেকেই। সেখানে বিস্ফোরণের কারণে ও দেয়াল ভেঙে যাওয়ায় আগুনে গোলা ছড়ায় রাস্তায়। এ কারণে যানজটে থাকা বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, প্রাথমিকভাবে আমার মনে হয়েছে, আগুনের কারণ কেমিক্যাল এবং তা ছিল ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলায়। সেখান থেকে জব্দ করা আলামত পরীক্ষায় এটি নিশ্চিত হতে পেরেছি। তিনি আরও বলেন, ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে যেসব কেমিক্যালের আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে তার বেশিরভাগই দাহ্য রাসায়নিক। ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকের তালিকা করছে ফায়ার সার্ভিস : গতকালও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও দোকান মালিকদের তালিকা করছিলেন। এ বিষয়ে আবদুস শহীদ নামে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা বলেন, তালিকা সম্পন্ন হয়নি; কাজ চলছে।