শিরোনামটিই বলে দেয় কেমন অসহায় দশাতে আমরা নিপতিত। আমাদের রাষ্ট্র আজ গণতান্ত্রিক ধারা থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অমানবিকতার থাবায় বিক্ষত সমাজ। অর্থনৈতিক উন্নতি-অবকাঠামোগত অগ্রগতি দেশকে অনেকটা এগিয়ে রাখছে ঠিকই কিন্তু গণতান্ত্রিক ভিত্তি না থাকলে তা কতটুকু টেকসই হবে এ ভাবনা কিন্তু সচেতন মানুষ এড়াতে পারছেন না। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে পাওয়া শক্তিই এখন সুন্দরের পথ খুঁজে পেতে শেষ ভরসা। আধুনিক জাতি, রাষ্ট্র ও সমাজ রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। রাজনীতিকে অস্বীকার করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণও সম্ভব নয়। এ কারণে দেশ যখন নষ্ট রাজনীতির হাতে বন্দি হয়ে পড়ে তখনই সকল ক্ষেত্রে হতাশা নেমে আসে।
এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া-আসা করা দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। একমাত্র নির্বাচনে ভোট প্রদান ছাড়া আর কোনো দৃশ্যমান গণতান্ত্রিক আচরণ চিহ্নিত করার উপায় নেই। আবার এই ভোটাধিকার প্রয়োগও সব সময় স্বাভাবিক পরিবেশে হতে পারছে তাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। গণতন্ত্রহীনতা স্বৈরতন্ত্রকেই উৎসাহিত করে। তা স্পষ্ট হয় বড় দুই দলের দিকে তাকালে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলে দলীয় প্রধানের হাতেই সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে। এই অবস্থায় সুবিধাবাদই প্রশ্রয় পায়। দলীয়করণ প্রকট হয়ে দেখা দেয়। গণতান্ত্রিক চর্চা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে টাকা প্রধান নিয়ামক হিসেবে শক্ত অবস্থান নেয়। আর এই সূত্রেই দুর্নীতি সর্বগ্রাসী রূপ নিতে থাকে। সন্ত্রাস আর নৈরাজ্যের বাড়বাড়ন্ত সমাজ জীবনকে বিষময় করে তোলে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জাতির ভাগ্য নির্মাণের প্রাণকেন্দ্র সংসদ। সাধারণ ভোটার তাদের মূল্যবান ভোট দিয়ে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন সংসদে গিয়ে জনগণের জন্য কথা বলতে। মাননীয় সাংসদরা আইনপ্রণেতা। এ কারণে বিশেষ সম্মানিত অবস্থান রয়েছে তাদের। কিন্তু এদেশের গণতন্ত্র বোধহীন ‘গণতান্ত্রিক’ দলগুলো কখনো গণতন্ত্রকে শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে দেয়নি। সংসদের মতো পবিত্র জায়গাকে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়Ñ যদি কখনো বিরোধী দলের সাংসদরা অভিমান ভুলে সংসদে উপস্থিত থাকেন তখন সংসদ কক্ষ নিম্নমানের রাজনৈতিক ঝগড়ার কেন্দ্রে পরিণত হয়। কখনো কখনো আমাদের মান্যবর সাংসদদের দায়িত্ব পালন ও তাদের দলীয় বক্তব্য শুনলে মনে হয় না ভোটারদের প্রতি তাদের কোনো কমিটমেন্ট আছে। দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তার বাইরে খুব একটা ভূমিকা রাখেন না তারা। বিগত দুই সংসদে প্রকৃত অর্থে বিরোধী দল না থাকায় অবশ্য ঝগড়াঝাটির পরিবেশ তৈরি হয়নি।
অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে গণতান্ত্রিক বোধহীনতার প্রকাশ রয়েছে পদে পদে। গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ জনগণের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নেওয়া, এর প্রতি শ্রদ্ধা স্থাপন করাÑ তা তো নির্বাসিতই হয়ে গেছে। বক্তৃতার মঞ্চ ছাড়া জনগণ উপেক্ষিত প্রকাশ্য রাজনৈতিক আচরণেও। এক সময় রাজনীতিকদের নির্বাচনের সময় জনগণকে প্রয়োজন পড়ত। বিএনপির শাসনামলে তাও হালকা হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচন নির্বাচন খেলার যাবতীয় আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল তখন। ‘জনগণ’ শুধু প্রতীকমাত্র। আমরা একটু পেছনে তাকাতে পারি। শেষবারের রাজত্বে নির্বাচনী রায় নিজ অনুকূলে রাখার যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে নিশ্চিন্তে কালাতিপাত করছিলেন বিএনপি নেতানেত্রীরা। তারপর বিএনপির দুর্নীতিবাজ সকল রক্তবীজ অসংখ্য বিএনপি-প্রাণ ভালো মানুষ কর্মী-সমর্থকদেরও ক্ষুব্ধ করে নিশ্চিন্ত মনে জাতির কলজে খুবলে যাবতীয় মধু আকণ্ঠ পান করছিল। যে ম্যানুফ্যাকচার্ড ভোটার তালিকার ওপর গোটা নির্ভরতা রেখে বিএনপির ক্ষমতাবান নেতানেত্রীরা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে দুর্নীতি করে যাচ্ছিলেন আর চিরস্থায়ী ক্ষমতাবান ভেবে ধরাকে সরা জ্ঞান করছিলেন মুহূর্তের উল্কাপতনে তাই প্রথম খুন হতে থাকে বিএনপি। পাঠক নিশ্চয় মনে রাখবেন প্রথমবারের মতো ছবিযুক্ত নতুন ভোটার তালিকায় নির্বাচনের ঘোষণাতে তাই অনিবার্য অশনি সঙ্কেত দেখা দিয়েছিল বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার প্রশ্নে। দৃশ্যত জোটবন্ধু জামায়াতে ইসলামীর ইচ্ছেতেই নির্বাচন নামের মরণফাঁদে (বিএনপি-জামায়াত জোটের জন্য) পা দিয়েছিল বিএনপি। তাই ২০০৮-এর নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের এই হিসাব করতে কোনো ক্লেশ হয়নি যে নতুন ভোটার তালিকায় ব্যাপক সংখ্যক ভোটার যদি কোনো ধরনের চাপে না থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে তবে বিএনপি জামায়াত বধ সম্পন্ন হবে। আর পরিস্থিতির সুবিধায় একমাত্র বিকল্প হিসেবে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট গণসমর্থন পেয়ে যাবে।
নিকট অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে বা না থেকে আওয়ামী লীগও যে গণতান্ত্রিক আচরণের পরাকাষ্ঠা দেখাতে পেরেছিল সে কথা বলতে পারবে না ইতিহাস। জনকল্যাণের চেয়ে সন্ত্রাসী পোষণ অথবা দলীয় সন্ত্রাসীদের শাসন না করা আর দলীয়করণের সাংস্কৃতিক আচরণ প্রকাশ্যেই দেখিয়ে যাচ্ছিল দলটিতে। আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার যুগে চাঁদাবাজি আর দখল বাণিজ্য কম করেনি দলের সহযোগী সংগঠনের ক্যাডাররা। এজন্য আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কোনো রকম অনুশোচনা প্রকাশ করেছে এ কথা বোধকরি কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। এভাবে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো গণমুখী না হয়ে দলমুখী হওয়ার সংস্কৃতিই বাঁচিয়ে রাখল। তারা কোনোভাবেই নিজেদের শোধরাতে পারেনি। তাই এখন গৎবাঁধা হয়ে গেছে দলীয় প্রতিক্রিয়া। সাধারণ মানুষের মুখস্থ হয়ে গেছে যে, নির্বাচনে বিজয়ী দল বলবে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে আর পরাজিত দল বলবে স্থূল বা সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে তাদের হারানো হয়েছে। সরকার গঠনের অল্পদিন পরই বিরোধী দলের নেতারা অসহিষ্ণু হয়ে পড়বেন। পাঁচ বছর ধরে জনগণের মনে আসন পাওয়ার মতো চেষ্টা, ক্ষমতা বা ধৈর্য কোনোটাই তাদের থাকে না। তাই সরকার যাতে স্বস্তি না পায় সেই ব্যবস্থা করতে থাকবেন। জনগণ গ্রহণ করুক বা না করুক শ্রাব্য-অশ্রাব্য ভাষায় বক্তৃতা-বিবৃতি দিতেই থাকবেন। যতই হাস্যকর হোক তবু দমে দমে সরকারকে পদত্যাগ করতে বলবেন আর মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি করবেন।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট আলাদা। প্রধান বিরোধী দল বলে পরিচিত বিএনপির ডানা ছঁাঁটা হয়ে গেছে। অপশক্তির জোগানদাতা জামায়াতে ইসলামী সরাসরি সামনে আসতে পারছে না। নেতৃত্বের দুর্বলতায় আর বিরুদ্ধ পরিবেশে মাথা তুলে দাঁড়ানোর তেমন শক্তি দৃশ্যত নেই। সুতরাং আওয়ামী লীগ সরকার বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এমন মনে হয় না।
স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে ১৯৭৫-এর পর থেকে জনপ্রতিনিধিত্বের দর্শনটা পাল্টে গেল। গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা নিয়ে যে দেশ স্বাধীন হলো সে দেশের গণতন্ত্রের চর্চাকারী ঐতিহ্যবাহী দলের অপরিণামদর্শী দুর্বল নেতৃত্ব বিরুদ্ধ স্রোতের মুখে ঐতিহ্য আর আদর্শ থেকে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারলেন না। প্রথমে সামরিক শাসন অতঃপর এর বেসামরিক লেবাস দেখে এরা যেন হতাশ হয়ে পড়লেন। এ সময় থেকে এদেশের রাজনীতি হয়ে গেল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নামাবরণে ক্ষমতায় পৌঁছার প্রতিযোগিতার রাজনীতি। গণতন্ত্র আর পূর্ণ অবয়ব নিয়ে দাঁড়াতে পারল না। জেনারেলরা সেনা ছাউনি থেকে এসে প্রথমে ক্ষমতা দখল করলেন, পরে উর্দি খুলে নতুন দলের নাম আর দর্শন প্রচার করে বেসামরিক হয়ে গেলেন। রাজনীতির মাঠের সুবিধাবাদী এবং সুবিধা অন্বেষী মানুষগুলোকে দলে ভেড়াতে পারলেন সহজেই। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত এর বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ল। রাজনীতির নামে ছাত্র সমাজের একাংশের আদর্শের মেরুদ- ভেঙে ফেলা হলো। পেশাজীবী সংগঠনগুলোর নৈতিকতার ভিত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। এরমধ্যে কথাসর্বস্ব হয়ে যাওয়া বাম দলগুলোর মধ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার মানসিক বল আর অবশিষ্ট ছিল না। অন্যদিকে গড্ডলিকায় গা ভাসাল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ। এখন বড় দলগুলোর একটাই মোক্ষ হলো নির্বাচন নির্বাচন খেলার মধ্য দিয়ে কীভাবে একে অন্যকে ডিঙিয়ে ক্ষমতায় পৌঁছা যায়। প্রতিযোগিতার গতি এত দ্রুত যে, জনদরদী নেতা হয়ে ভোটারের মনোরঞ্জনের মতো ফুরসত কারও হাতে থাকল না।
তারপরও আমরা বিশ্বাস করতে চাই আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থকে অতিক্রম করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান। ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তবতার ভেতর থেকেও বিপন্ন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার ফিরিয়ে আনতে চান। প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির সদম্ভ বেড়ে ওঠার অশুভ তৎপরতাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিংড়ানো তীক্ষè রশ্মি দিয়ে ঝলসে দিতে চান। দেশের সাধারণ মানুষের বড় অংশও এই সুন্দরের প্রতীক্ষায় উদ্বাহু।
যেহেতু এদেশের রাজনীতি বহুকাল ধরেই নানা রকম দুর্বলতার মধ্যদিয়েই বেড়ে উঠেছে তাই নির্ভেজাল গণতন্ত্র পাওয়া আমাদের জন্য দুরূহ। দুর্বল হয়ে যাওয়া বিএনপি সহসাই রাজনীতির মাঠে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তেমন বোধ হয় না। এমন অবস্থায় স্বৈরতন্ত্র শক্তিশালী হয়ে পড়ার সম্ভাবনা। তবুও আমরা সুন্দরের প্রত্যাশা করি। অনেক সীমাবদ্ধতার পরও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। তিনি যদি অগ্রগতির ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন তবে বাংলাদেশকে অনেক বেশি উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আর এই শক্তি পাওয়া সম্ভব মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার মধ্য দিয়ে।