ভারতের বিমান হামলা মূলত রাজনৈতিক পাঁয়তারা

কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখার অন্যপারে ভারতের সীমিত আকারের বিমান হামলা এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার হুঁশিয়ারি, যতটা না সর্বাত্মক যুদ্ধের পূর্বলক্ষণ তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক পাঁয়তারা বলেই মনে হচ্ছে। দুই পরমাণু অস্ত্রধারী প্রতিবেশী আরেকদফা মুখোমুখি হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশা অন্তত সেটাই।

যৌক্তিকভাবে বললে, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর কারও পক্ষেই আরেকটি পূর্ণমাত্রার সংঘাতের ভার বহন করা সম্ভব নয়।  ইমরান খানের ক্ষেত্রে এর কারণ হচ্ছে তিনি গত জুলাই মাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসার পর এখনো কাজকর্ম শুরু করার পর্যায়ে আছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্র মোদির জন্য কারণটি হচ্ছে, তিনি আসন্ন নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয় মেয়াদের মতো ক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিত করতে চান।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে তিনটি বড় সংঘাত হয়েছে তার মধ্যে দুটিই ঘটেছে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে। এগুলোর মধ্যে একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ, ১৯৯৯ সালের কারগিল সংঘাত ও প্রায়শই ঘটে চলা তুলনামূলকভাবে ছোট লড়াইগুলোতে কোনো সমাধান আসেনি। কাশ্মীর সেই তখন থেকে বিভক্ত, বিরোধপূর্ণ আর সহিসংতাপ্রবণই রয়ে গেছে। স্বল্পমাত্রার বিদ্রোহ সেখানে সবসময়ই ঘটে চলেছে। অঞ্চলটি নিয়ে দ্বন্দ্ব লেগেই আছে, যার ফায়দা নিচ্ছে উভয়পক্ষের চরমপন্থীরা।

পুলওয়ামায় আধাসামরিক বাহিনীর ওপর ১৪ ফেব্রুয়ারির রক্তক্ষয়ী হামলার পর নরেন্দ্র মোদি স্পষ্টতই কিছু করার তাগিদ বোধ করছিলেন। আজাদ কাশ্মীরভিত্তিক ইসলামি জঙ্গিদের চালানো ওই হামলায় নিহত হয় আধাসামরিক বাহিনীর ৪৪ সদস্য। জনমত আর মোদির রাজনৈতিক বিরোধীরা চাইছিল মোদি কিছু একটা করুন। মোদির জন্য মঙ্গলবারের ঝটিকা ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ ছিল স্থল অভিযানের তুলনায় কিছুটা কম ঝুঁকিপূর্ণ এক উপায়। স্থল অভিযানে সময় যেমন বেশি লাগত তেমনি পাকিস্তানকে অনিবার্যভাবেই সামরিক উপায়ে তাৎক্ষণিক জবাব দিতে হতো।

উত্তেজনা অতি বেড়ে গেলে ঠিক এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে পারতÑ যেমনটা অতীতে দেখা গেছে। এতে মোদিকে আরও গুরুতর পদক্ষেপ নিতে হতো। তবে সে সম্ভাবনা এখনো রয়ে গেছে। তবে এ পর্যন্ত মনে হচ্ছে ভারত প্রতিশোধের মাত্রাটা সীমিত রাখতেই চাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান উত্তেজনা আরও না বাড়িয়ে অন্তত ভারতীয় হামলার পর পর যে রকম ধীরস্থিরভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করেছেন তা এতে সহায়ক হয়েছে। ইমরান দৃশ্যত যৌক্তিক অবস্থান নিয়ে বলেছেন, আত্মরক্ষার জন্য তার দেশের ‘যথাযথ ব্যবস্থা’ নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

তাহলে কি পাকিস্তানের নেতারা অবশেষে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন? পাকিস্তানের পক্ষে অধিকতর শক্তিমান ও সম্পদশালী ভারতকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। চেষ্টা করলেও তারা হেরে যায়। পরমাণু অস্ত্র কোনো সুবিবেচনার পথ নয়।  তবে দেশটি সফলভাবে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা জোরদার করছে।

চীন পাকিস্তানের শক্তিশালী বন্ধু ও বিনিয়োগকারী। দেশটি চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ বা ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ প্রকল্পের একটি ক্রমবর্ধমান সামরিক মাত্রিকতাও রয়েছে। সদ্য ইসলামাবাদ সফর করে গেলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনিও পাকিস্তানের এক ধনাঢ্য পৃষ্ঠপোষক।  অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বদৌলতে পাকিস্তান এখন ওয়াশিংটনের ‘দমবন্ধ করা আলিঙ্গন’ থেকে ক্রমেই যেন মুক্তি পাচ্ছে। ভারতের মতোই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগ তুলে ট্রাম্প গত বছর পাকিস্তানকে নিরাপত্তা সহায়তা কর্তন করেন। ওই ঘটনা এবং আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য প্রত্যাহারে পাকিস্তানে অনেকেই উৎফুল্ল। বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘কৌশলগত অধীনতার’ অবসান হিসেবে দেখে তারা একে স্বাগত জানিয়েছেন।

সুতরাং কাশ্মীরে ১৪ ফেব্রুয়ারির হামলার পর পর ভারত পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে ‘সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন’ তথা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হেয় করার যে প্রত্যয় ঘোষণা করে তা একটু বেশিই বলা হয়ে গেছে। বাস্তবে হয়তো এতটা সম্ভব হবে না।  আর এ বিষয়টি ভারতের হতাশাকে আরও বাড়িয়েই তুলতে পারে কেবল। অন্যদিকে ‘ঠাণ্ডা মাথার’ ইমরান উগ্র ডান ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে আশকারা দিচ্ছেন বলে মনে হলে তিনিও তাসের চালে ভুল করে ফেলবেন।

পাকিস্তানের গত নির্বাচনের প্রচারের সময় তেমনটাই দেখা গেছে। ভারত প্রমাণ দিলে ১৪ ফেব্রুয়ারির হামলার জন্য জইশ-ই-মোহাম্মদের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্ত করার অঙ্গীকার আর পাশাপাশি ‘শান্তিকে সুযোগ দেওয়ার জন্য’ মোদির প্রতি আহ্বান ইমরানের জন্য যথেষ্ট হবে বলে মনে হয় না। সপ্তাহান্তে রাজস্থানে এক নির্বাচনী সভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি সন্ত্রাসবাদের বিষয়টিকে লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানকে পিটিয়ে যাবেন। হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মতৈক্য হয়েছে। এবার হিসাব চুকানো হবে। চিরতরে।’ বিমান হামলার পর মোদি বড় গলা করেই বলেন, ভারত উত্তেজনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভীত নয়। ভারতের অন্য মন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে আরেককাঠি এগিয়ে। তারা বিমান হামলার ঘটনাকে ‘বিশাল বীরত্ব’ আখ্যা দিয়ে তা উদযাপন করেছেন।

পাকিস্তান প্রতিশোধ নিলে আরও শক্তিশালী ও কঠোর আঘাতের অঙ্গীকার করেছেন তারা।

এ ধরনের যুদ্ধংদেহী কথাবার্তা হয়তো মোদির সমর্থকদের কাছে নির্বাচনী কৌশল হিসেবে কাজের মনে হতে পারে। কিন্তু তারাও যদি একটু সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিতে নজর দেয় তাহলে দেখবে ভারতের পুরনো কাশ্মীর সমস্যার একমাত্র সমাধান হতে পারে রাজনৈতিক পথেই। এ মত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হাপিমন জ্যাকবের। ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় জ্যাকব লিখেছেন, ‘আগ্রাসী কৌশল দক্ষিণ কাশ্মীরের জনমতকে ভারতের বিরুদ্ধবাদী করে তুলেছে। কাশ্মীরে ভারত একটি জটিল পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছে। তাই কাশ্মীরকে পথে ফেরাতে হলে চাই রাজনৈতিক দক্ষতা, নেপথ্য যোগাযোগ আর ব্যাপক রাজনৈতিক দূরকল্প।’

লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক

ও ‘গার্ডিয়ান ইউএস’-এর সম্পাদক।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ