বিগত ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরগামী ভারতীয় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের ট্রাকে আক্রমণ করে কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ৪৯ জন সিআরপিএফ সদস্যকে হত্যা এবং বহুজনকে আহত করা হয়েছে। হামলার কথা স্বীকার করেছে পাকিস্তানভিত্তিক ইসলামি জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ। ভারতের দাবি, পাকিস্তানে এ জাতীয় জঙ্গিগোষ্ঠী রয়েছে ৩০টি। গোষ্ঠীগুলোকে পাকিস্তান সরকার বেআইনি ঘোষণা করেছে। কিন্তু বেআইনি হলেও পাকিস্তানের ইন্ধনে এরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারত অভিযোগ করে আসছে, সংগঠনগুলো পাকিস্তানের মদদপুষ্ট। এ অঞ্চলে জইশ-ই-মোহাম্মদ আর লস্করে তৈয়বার জঙ্গি তৎপরতা বেশি। জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহার। তাকে জাতিসংঘের মাধ্যমে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করেছিল আমেরিকা। কিন্তু চীনের ভেটোর কারণে তা সম্ভব হয়নি। এখন এই জঙ্গি তৎপরতাকে কেন্দ্র করে দুই দেশ সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যা এই অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতিকে জটিল ও নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের পর থেকেই স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুদ্ধও হয়েছে বেশ কয়েকবার। ভূস্বর্গ খ্যাত জম্মু-কাশ্মীর এলাকা নিয়ে পুরনো দ্বন্দ্ব এখনো অব্যাহত। কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের প্রথম যুদ্ধ হয় ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের কয়েকদিনের মধ্যেই। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয় ১৯৪৯ সালে। কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব উভয় দেশই মেনে নেয়; কিন্তু আজ অবধি সেই প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই যুদ্ধে কাশ্মীর ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্তানে চলে যায় মোজাফফরাবাদ, পুঞ্চ ও মিরপুর (পরবর্তীকালে ‘আজাদ কাশ্মীর’) এবং গিলগিট-বালটিস্তান। ভারতে রয়ে যায় জম্মু কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ ও সিয়াচেন হিমবাহ। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন আসকাই চীন দখল করে নেয়। এখন কাশ্মীরের আর একক মালিকানা কারও হাতে নেই। মালিকানা চলে গেছে তিন দেশের হাতে। ভারতে আছে ৪৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ৩৭ শতাংশ এবং চীনে ২০ শতাংশ।
দেশভাগের সাত দশক অতিবাহিত হলেও এ সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশ যুদ্ধ করেছে তিন বারÑ ১৯৪৭, ১৯৬৫ ও ১৯৯৯ সালে। তিনবারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রায় ৫০ হাজার লোক মারা গেছে বলে এক হিসাবে বলা যায়। পরমাণু শক্তির অধিকারী দেশ দুটিই সমগ্র কাশ্মীর নিজেদের দখলে রাখতে চায়। সে ক্ষেত্রে কাশ্মীরি জনগণের নিজেদের ভাগ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ খুবই কম। অথচ কাশ্মীর সমস্যার প্রকৃত সমাধান তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত আছে।
কাশ্মীরের পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় দুই দেশ আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এরমধ্যে ভারতীয় দুইটি যুদ্ধবিমানকে ভূপাতিত করা এবং একজন পাইলটকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে পাকিস্তান। অপরদিকে ভারত দাবি করেছে তারা পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরে হামলা চালিয়ে ৩২৫ জন জঙ্গিকে হত্যা করেছে। সীমান্তে পাল্টাপাল্টি হামলায় পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে দুই শিশুসহ চারজন নিহত হয়েছেন। আর ভারতের পাঁচ জন সেনা আহত হয়েছেন। দুদেশের এই চলমান সংঘাতমুখর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বিশ্ববাসীর। প্রতিবেশী দেশগুলো ভাবছে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ফলে এই মহাদেশ ব্যাপক ক্ষতির শিকার হবে।
বিশ্ববাসী চায় না একুশ শতকে যুদ্ধের মতো কোনো ঘটনা ঘটুক। গবেষকরা বলছেন, এখন যদি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় তবে, দুই দেশই কমপক্ষে ১০০ বছর পিছিয়ে যাবে। এ ছাড়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ জনগণ ও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো।