রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক দুটি সিন্ডিকেট বছরের পর বছর স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে একটিতে নেতৃত্ব দেয় ব্যবসায়ী আবু আহমেদ। আরেকটির নেতৃত্বে হাকিম ও সাত্তার নামে দুজন। মাঝে মধ্যে পাচারের সময় স্বর্ণ আটক হলে কিছুদিন এ সিন্ডিকেট নিয়ে হইচই হয়। পরে ঝিমিয়ে পড়ে সবকিছু এবং আগের মতোই চলতে থাকে। কসমেটিকস ব্যবসার আড়ালে চলছে এই স্বর্ণ চোরাচালান। গত রবিবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জোরারগঞ্জ এলাকায় ৬০০ পিস এবং নগরীর সিআরবি এলাকায় ১০০ পিস স্বর্ণের বারসহ চারজন গ্রেপ্তারের পর নতুন করে রিয়াজউদ্দিন বাজার সিন্ডিকেটের বিষয়টি উঠে এসেছে পুলিশের অনুসন্ধানে। এদিকে পুলিশেরই একটি পক্ষ জানিয়েছে, তাদেরই কতিপয় কর্মকর্তার আশীর্বাদ ছাড়া এ ব্যবসা এত দীর্ঘ সময় ধরে কিছুতেই চলতে পারে না।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মশিউদ্দৌলা রেজা জানিয়েছেন, জোরারগঞ্জে গ্রেপ্তারকৃত দুই যুবক পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে, তারা রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে ৬০০ পিস স্বর্ণের বার ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে নগরীতে গ্রেপ্তারকৃতরা রিয়াজউদ্দিন বাজারের কথা স্বীকার না করলেও এটাও রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে বের হয়েছে এবং পরে নগরীর প্রবর্তক মোড় ঘুরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় যাচ্ছিল বলে নগর গোয়েন্দা শাখার উপপুলিশ কমিশনার মো. মোস্তাইন হোসেনের ধারণা।
স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযান পরিচালনাকারী নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে জানান, রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট দেশের অন্যতম বড় একটি সিন্ডিকেট। দুটি চোরাচালান সিন্ডিকেট এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দীর্ঘদিন ধরে। সিন্ডিকেটে নতুন সদস্য যুক্ত হয়। তারাই মূলত রিয়াজউদ্দিন বাজারে গুদাম ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলেছে অবৈধ স্বর্ণের ভান্ডার। এর মধ্যে একটিতে নেতৃত্ব দেয় ব্যবসায়ী আবু আহমেদ। আরেকটিতে হাকিম ও সাত্তার নামে দুজন।
রিয়াজউদ্দিন বাজারে প্রসাধনীর (কসমেটিকস) দোকানদার হিসেবে পরিচিত আবু আহমেদ। তবে কসমেটিকসের আড়ালে তার মূল ব্যবসা স্বর্ণ চোরাচালান ও হুন্ডি। রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক বড় একটি স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের মূল ব্যক্তি হিসেবে আবু আহমেদের নাম পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে ২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারি; যেদিন রাতে নগরীর কোতোয়ালি থানার রিয়াজউদ্দিন বাজারে বাহার মার্কেটের ছয়তলার দুটি কক্ষ থেকে তিনটি লোহার সিন্দুক জব্দ করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এর মধ্যে একটি সিন্দুকে আড়াইশ স্বর্ণের বার এবং আরেকটিতে ৬০ লাখ টাকা পাওয়া যায়। এ ঘটনায় নগরীর কোতোয়ালি থানায় আন্তঃদেশীয় স্বর্ণ চোরাচালানকারী আবু আহমেদ ও তার ম্যানেজার এনামুল হক ওরফে নাঈমকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। দুবাইকেন্দ্রিক চোরাকারবারি এনামুল হক ওরফে নাঈম পুলিশ রিমান্ডে স্বীকারোক্তি দেয়, দুবাই থেকে চোরাচালান চক্রের পাঁচ সদস্য স্বর্ণ পাঠায় চট্টগ্রামে। সেই স্বর্ণ রিয়াজউদ্দিন বাজারে নিয়ে আসা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করে চক্রের আরও পাঁচ সদস্য। স্বর্ণ চোরাচালান ব্যবসা পরিচালনায় আবুকে সহযোগিতা করে দুই ব্যবসায়ী নেতা ও এক ব্যবসায়ী। এর বিক্রির টাকা হুন্ডির মাধ্যমে আবুর কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহায়তা করে এক বিতর্কিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও সাবেক এক চসিক কাউন্সিলর।
এদিকে গোয়েন্দা পুলিশের অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, রিয়াজউদ্দিন বাজারে স্বর্ণ চোরাচালানে সক্রিয় সদস্যদের মধ্যে বর্তমানে আছে আবুর ম্যানেজারখ্যাত আসিফ। তার সঙ্গে রয়েছে আবুর সেকেন্ড ম্যানখ্যাত জাহিদ, জসিম প্রকাশ সিএনজি জসিম, আজগর, চাচাতো ভাই নেজাম, রহিম, ওসমান, আলমগীরসহ হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান ও সাতকানিয়ার ১০-১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট। নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, তামাকুমু-ি লেন এলাকায় বিভিন্ন মার্কেটের কক্ষ ভাড়া নিয়ে অবৈধ স্বর্ণের গুদাম বানিয়েছে আবু, হাকিম ও সাত্তারসহ অন্যরা। মাঝে চোরাই সোনা মজুদ থেমে গেলেও এখন আবারও তা গতি পেয়েছে।
গত রবিবার জোরারগঞ্জে ধরা পড়া সোনা পাচারকারীদ্বয় জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে বিদেশ থেকে সোনা চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর হয়ে রিয়াজউদ্দিন বাজার নিয়ে আসার কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে। ওই দুই আসামি জানায়, তারা ১০ জন যাত্রী নির্দিষ্ট করে, ওদের দেশে আসার প্লেন ভাড়া তারাই দেয়। তাদের কাজ থাকে সামান্য। তারা সামনের সিটের ব্যাক পকেটে প্যাকেটটা রেখে দেয়। দেশে আসার পর যে যার মতো চলে যায়। এরপর প্লেনে উঠে বিমানবন্দরের ক্লিনাররা। তাদের সুপারভাইজারের সঙ্গে চুক্তি থাকে। তারাই সেগুলো সংগ্রহ করে নামিয়ে নেয়। দ্বিতীয় কৌশলটি হলো, একইভাবে নির্দিষ্ট যাত্রীদের বলা হয় ওয়াশরুমের ডাস্টবক্সে প্যাকেটটা ফেলে দিতে। তারা তা-ই করে। দেশে আসার পর ক্লিনাররা ডাস্টবক্সের পলিথিন মুখ বন্ধ করে নিয়ে নেয় একটি বড় বাক্সে।
এরপর তা নির্দিষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায়। বেরোনোর পর এজেন্ট সিএনজি অটোরিকশায় সিমেন্ট ক্রসিং পর্যন্ত চলে আসে। সেখান থেকে উঠে যায় লোকাল বাসে। কিছু দূর পর নেমে উঠে টেম্পো বা সিএনজি অটোরিকশায়। আরও কিছু দূর যাওয়ার পর অপেক্ষারত মোটরসাইকেলে করে এসে রিয়াজউদ্দিন বাজারে ঢুকে পড়ে। বিমানবন্দর দিয়ে আসা চোরাচালানের স্বর্ণ প্রথমে রিয়াজউদ্দিন বাজারের ভাড়া করা গুদামে জমা হয়। এরপর সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন বাজারে যায় এবং বিদেশে পাচার হয়।
গ্রেপ্তার চার কারবারি রিমান্ডে
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে গাড়িতে ৬০ কেজি সোনা উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই স্বর্ণকারবারির ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। একই সঙ্গে নগরী থেকে আটক দুজনের ৪ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। গতকাল সোমবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমা- আবেদন করলে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহীদুল্লাহ কায়সার এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) এস এম মোস্তাইন হোসেন জানান, মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ উত্তর সোনাপাহাড় এলাকা থেকে ৬০০ পিস স্বর্ণের বারসহ আটক করিম খান কালু ও রাকিবকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন জানান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত তাদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। অন্যদিকে নগরীর সিআরবি এলাকা থেকে আটক প্রলয় কুমার সাহা ও বিল্লাল হোসেনের চার দিন করে রিমান্ড পায় পুলিশ।
গত রবিবার পৃথক ঘটনায় ৭০০ স্বর্ণের বারসহ ৪ কারবারিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ সোনাপাহাড় এলাকায় একটি জিপ থেকে ৬০ কেজি (৬০০ পিস স্বর্ণের বার) ও নগরীর সিআরবি এলাকায় অপর একটি প্রাইভেটকার থেকে ১০০ পিস স্বর্ণ জব্দ করে পুলিশ।