সম্পদের হিসাব দেয়নি ৪২ জেলার ভূমি কর্মচারীরা

৪২ জেলার ভূমি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব পায়নি মন্ত্রণালয়। বাকি ১৯ জেলা ও বিভিন্ন অধিদপ্তরের কর্মচারীরা হিসাব জমা দিয়েছেন। তাদের সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাব আপাতত বিশ্লেষণ করা হবে না; সংরক্ষণ করা হবে। সব হিসাব জমা হওয়ার পর তাদের সম্পদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। এ সম্পর্কে ভূমি সচিব মোখলেছুর রহমান পাটোয়ারি গতকাল মঙ্গলবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ভূমি মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন অধিদপ্তরের কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব সময়মতো পেয়েছি। এ পর্যন্ত ১৯ জেলার হিসাবও চলে এসেছে। অবশিষ্ট জেলাগুলোর হিসাব হয়তো ডিসি অফিসে জমা হয়ে গেছে। শিগগিরই তা পেয়ে যাব। আর সবার হিসাব বিবরণী জমা হওয়ার পর সম্পদের হ্রাসবৃদ্ধি বিশ্লেষণ করা হবে। কারও অর্জিত সম্পদ অবিশ^াস্য রকম বেশি হলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গত ১৭ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব দপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ জারি করে ভূমি মন্ত্রণালয়। গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্জিত সম্পদ নির্ধারিত ছকে নিজ নিজ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জমা দেওয়ার কথা ছিল। এই সময়ের মধ্যে দপ্তর-অধিদপ্তরের কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা হলেও মাত্র ১৯ জেলার হিসাব বিবরণী জমা পড়েছে। তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে ভূমি অফিস নেই। এই অবস্থায় পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য গত ৩ মার্চ রবিবার জরুরি বৈঠকে বসেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। ভূমি সচিবের সভাপতিত্বে বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের একটি কল সেন্টার পরিচালনার নীতিমালা তৈরির জন্য কমিটি গঠন, ভূমি সেবা সপ্তাহ, অনলাইনে ভূমি খতিয়ান প্রকাশ, ভূমি তথ্যসংবলিত একটি বুকলেট প্রকাশের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। বৈঠকে যেসব জেলার হিসাব বিবরণী জমা হয়নি সেসব জেলা থেকে জরুরি ভিত্তিতে হিসাব বিবরণী সংগ্রহের জন্য মন্ত্রণালয়ের আইন অনুবিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ জেলার ভূমি অডিটর আসমা বেগম সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেওয়ার ভয়ে চাকরি থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নিয়েছেন। তিনি গত ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বেচ্ছা-অবসরের আবেদন করেন। চাকরি ছাড়ার আবেদনপত্রে ব্যক্তিগত কারণের কথা বলা হলেও তিনি অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের কারণে চাকরি ছাড়ার আবেদন করেছেন। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ভূমি সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’  

কর্মকর্তারা আরও জানান, যেসব সংস্থার কর্মচারীদের কাছ থেকে সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ভূমি সংস্কার বোর্ড, ভূমি আপিল বোর্ড, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, ভূমি প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) ও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস। এ ছাড়া ডিসি অফিসের এলএ এবং 

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব-এর দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মহানগর ভূমি অফিস কিংবা উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত কানুনগো, সার্ভেয়ার, নামজারি সহকারী, অফিস সহকারী ও এমএলএসএসরা এই সম্পদের হিসাবের আওতায় আসছেন। সংশ্লিষ্টদের নির্ধারিত ছকে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। ছকে কী আছে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, স্থাবর ও অস্থাবর দুই ধরনের সম্পদের তথ্য চাওয়া হয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে কৃষি ও অকৃষি জমি, ইমারত, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে আছে অলংকার, শেয়ার, বিমা, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, মোটরগাড়ি, কম্পিউটার, টেলিভিশন, এয়ারকুলার, রেফ্রিজারেটর ও ওভেন।

এদিকে শুধু কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়। প্রশ্নের মুখে পড়েছে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও। বিশেষ করে, ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। কারণ প্রজাতন্ত্রের গণকর্মচারীদের বিষয়ে অভিন্ন আদেশ জারি করার দায়িত্ব এই মন্ত্রণালয়ের।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব জেলা থেকে সংশ্লিষ্টদের সম্পদের হিসাব জমা হয়নি, দ্রুত সেসব জেলার সম্পদের হিসাব নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এসব হিসাববিবরণী পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আর শুধু কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হচ্ছে কেনÑ কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিধানও রয়েছে। আইন সমানভাবেই প্রয়োগ করা দরকার।’

১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুয়ায়ী প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরিতে প্রবেশের সময় তার ও তার পরিবারের সদস্যদের দখলে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক। বিধিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীকে প্রতি পাঁচ বছর পরপর সম্পদের হ্রাস ও বৃদ্ধি উল্লেখ করে সরকারের কাছে দাখিল করাও বাধ্যতামূলক। বিধিতে ক্যাডার বা নন ক্যাডার কর্মকর্তার কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ সব গণকর্মচারীর জন্য একই বিধান প্রযোজ্য।

সর্বশেষ ২০১৫ সালে ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়। ওই বছরের ১০ মার্চ ছিল সম্পদের হিসাব জমা নেওয়ার শেষ দিন। ওই দিনের মধ্যেই ভূমি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত নন ক্যাডার প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনামতো সংশ্লিষ্টরা সম্পদের হিসাব জমা দিলেও তা পর্যালোচনা করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এর আগে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়। ওই হিসাবও আজও বস্তাবন্দি হয়ে পড়ে আছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে। এসব বিবরণী পর্যালোচনা করে বলা হয়নি, কার সম্পদ বেড়েছে বা কমেছে। জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, ওই সময়ের সম্পদের হিসাব চাওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কারণ ওই সময় রাজনীতির রাঘব-বোয়ালদেরও বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। ট্রুথ কমিশন গঠন করে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারীদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই সময় কমিশনে তিন শতাধিক আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে শতাধিক আমলাও ছিলেন। যদিও পরে এ কমিশন বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং কমিশনে স্বীকার করার পরও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়; ধাপে ধাপে পদোন্নতিও দেওয়া হয়।