ছয় তদন্ত প্রতিবেদনে একই তথ্য

চুড়িহাট্টা আগুনের উৎস ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা

গত ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকেই। এই নিয়ে গঠিত ১০টি তদন্ত কমিটির ছয়টি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিবেদন নিয়ে সব কমিটিকে বসে সমন্বিত সুপারিশ দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র আরও জানিয়েছে, তদন্ত পক্ষপাতহীন করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ঘটনার পর সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে ‘সিলিন্ডার না রাসায়নিক’ এবং দুই সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া ও আমির হোসেন আমুসহ বিভিন্ন মহল থেকে দোষারোপের কারণে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এতে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি তদন্ত পক্ষপাতহীন এবং করণীয় নির্ধারণ করতে একাধিক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন ২১ ফেব্রুয়ারি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অগ্নিকা-ের কারণ সিলিন্ডার’ প্রথম দিন শিল্পমন্ত্রীর এই মন্তব্য এবং এই নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি

করপোরেশন গঠিত তদন্ত টিমের মধ্যকার বিরোধের পর প্রধানমন্ত্রী শিল্পমন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, চূড়ান্ত তদন্তের আগে কেউ কথা বলবেন না। জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে প্রত্যেকটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী দেখতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সিদ্ধান্ত না মানলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত শিল্প মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসি), ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ (ডিপিডিসি), ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হিসেবে ওয়াহেদ ম্যানশনে থাকা রাসায়নিকের কথা বলা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টায় আগুনের পর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে ১০টি তদন্ত কমিটি করা হয়। এগুলো হলোÑ শিল্প মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসি), ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কর্তৃপক্ষ (ডিপিডিসি), ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন। এছাড়া আরও দুটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেগুলো হলোÑজাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের চকবাজার থানা।

বিভিন্ন তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলা ও অন্য তলাগুলোতে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম থাকায় মুহূর্তে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরণের কারণে ভবনের দেয়াল ভেঙে আশপাশের প্লাস্টিকের দোকানেও বিস্ফোরণ ঘটে এবং লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। আর অগ্নিকা- যে ভয়াবহ রূপ নেয়, তার কারণ সেখানকার রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামে বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের কারণেই ভবনটির দেয়াল ভেঙে পড়ে। আর ওই ভবনের প্লাস্টিকের গুদামের কারণে আগুন ছড়িয়ে যায় আশপাশের ভবনগুলোতে।

বলা হয়, ওই ভবনের দোতলায় বাদামের তেল, রেঢ়ির তেল, জলপাইয়ের তেল, এয়ার ফ্রেশনার ও সুগন্ধি ছিল। এই এয়ার ফ্রেশনার ও সুগন্ধির  বোতলও রিফিল করা হতো সেখানে। এসব সামগ্রী উদ্বায়ী ও অতিদাহ্য পদার্থ। এসবের অন্যতম উপাদান ইথানলের ফ্লাশ পয়েন্ট ১৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছে পাওয়া তথ্যমতে, এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় ছিল প্রসাধনীসামগ্রী এবং বডি স্প্রে প্রস্তুত কারখানা ও গুদাম। সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থেকে সূত্রপাতের স্থান সম্পর্কিত বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

সিসি ক্যামেরা ফুটেজ থেকে দেখা গেছে, বিপুল পরিমাণ অতি দাহ্য পদার্থ থাকায় কোনোভাবেই সৃষ্ট আগুনে বিস্ফোরণ ঘটে দোতলার বাইরের অংশের দেয়াল ভেঙে রাস্তায় পড়ে এবং ভেতরের অংশের দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়ে। ভেতরে অক্সিজেনের ঘনত্ব কম থাকায় পাশের মসজিদের দিকে আগুন গড়িয়ে রাস্তায় যায়।

তবে আগুনের সূত্রপাতের কারণ জানতে হলে ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সিলিন্ডার বা বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারের কোনো বিষয় নেই উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পাশে বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো ট্রান্সফরমার ছিল না। বেশ দূরে যে ট্রান্সফরমার ছিল তা অক্ষত রয়েছে এখনো। আবার ভবনটির নিচে প্লাস্টিকের সামগ্রী বহনকারী পিকআপ ভ্যানটিও ডিজেলচালিত।  পাশে থাকা মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর।

এ বিষয়ে আইইবির তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব প্রকৌশলী কাজী খায়রুল বাশার দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত শনিবার তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা জমা দিয়েছি। এ পরিস্থিতির যেন আর সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সুপারিশ করেছি। আমাদের তদন্ত দল বলেছে, সেখানে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা নিচে কোনো সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়নি। সূত্রপাত দোতলা থেকেই। দোতলায় থাকা ওই এয়ার ফ্রেশনার রিফিলের জায়গায় কেউ সিগারেট ধরাতে পারে বা অন্য যেকোনো কারণে আগুন ধরে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। কারণ সেখানে দাহ্য পদার্থের ঘনত্ব বাতাসে অনেক বেশিই ছিল বা সেটাই স্বাভাবিক ছিল। আর আগুন রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে বা এক ভবন থেকে অন্য ভবনে গেছে। সব ভবনেই প্লাস্টিকের গুদাম ও দাহ্য পদার্থ ছিল। তাই যেখানেই দাহ্য পদার্থ পাওয়া গেছে, সেদিকেই আগুন এগিয়েছে। কেমিক্যালের গুদামের কারণে বিস্ফোরণের মাত্রা অল্প সময়ে বেড়েছে।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ সংলগ্ন ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে। এইঅগ্নিকাণ্ডে পাঁচটি ভবন একেবারে পুড়ে যায়। এতে তখন প্রাণহানি হয় ৬৭ জনের। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়।