নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৭০ বছর বয়সী নূর মোহাম্মদ। দুই-তিনশ বছরের পুরনো ভিটা তাদের। উঁচু ভিটার নিচ দিয়ে বয়ে গেছে কংস। সেদিকে তাকিয়ে নূর মোহাম্মদ বললেন, ‘বর্ষাকালে কংসর পানি যখন বাড়ত, ঘরবাড়ি তলায় নিয়া যাইত। এই জন্য আমাগো বাপদাদারা নদী থিইকা উঁচু ভিটা করছে। বর্ষা ছাড়াও কংসর পানি ভিটায় বাড়ি খাইত। আর এখন সেই কংস কত নিচে নাইমা গেছে। লাফ দিয়া পার হওন যায়।’
কীভাবে কংস এমন হলো জানতে চাইলে নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘নদীর পাড়ে মানুষ খুব একটা আইত না। রাস্তাঘাট ছিল না। ৫০-৬০ বছর আগে ডিএনডি বাঁধের সময় যখন রাস্তা হইল, তখন থিকাই নদী মরতে শুরু করে। কংসর যে শাখা আছিল, সেগুলাও নাই। এখন কোনডা নদীর জায়গা, কোনডা মানুষেরÑ বোঝা যায় না।’ সরেজমিনে ঘুরে, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সার্ভেয়ার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, একসময়
কংস নদীর তিনটি শাখা ছিল। এখন সেগুলো নেই। কংসের দুই উৎসমুখেরও নাজুক অবস্থা। এমনকি নদীর দুই পাশে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জের আড়াই শতাধিক খালের মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র ৩০টির মতো। কিছু খাল এখনো চিহ্নিত করা সম্ভব। কর্র্তৃপক্ষ চাইলে সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব।
দুই উৎসমুখ বন্ধ : বিভিন্ন উৎসের তথ্য অনুযায়ী, কংসের শুরু উত্তরে শীতলক্ষ্যার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুর অংশ থেকে। সেখান থেকে ডিএনডির মধ্যভাগ সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজির প্রধান সড়কের উত্তর পাশ দিয়ে ফতুল্লা ডিআইটি মাঠ ঘেঁষে দক্ষিণে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। এই ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর প্রাণ ছিল দুই মুখ। ১৯৬২-৬৮ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে প্রথম সেই দুই মুখ আটকে দেওয়া হয়। কংসের সঙ্গে বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার সংযোগ হিসেবে নদীর মূল প্রবাহ আটকে দিয়ে বাঁধের নিচে পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপ বসানো হয়। সেই থেকে নাব্য হারিয়ে কংস ধীরে ধীরে নালায় রূপ নেয়।
সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকার নূরু মেম্বারের পুল পাড়ের বাসিন্দা পরিবেশকর্মী ইয়াকুব কামাল জানান, কংসের শীতলক্ষ্যার মুখ এখন বন্ধ। প্রথমে কংস নদীর ওপর সিদ্ধিরগঞ্জ পুল করে নদীর মূল প্রবাহ নষ্ট করা হয়। পরে পুলের ওপর ডিএনডি বাঁধ করা হয়। এখন ডিএনডি বাঁধের নিচ দিয়ে কংসের পানিপ্রবাহের জন্য পাইপ বসানো হয়েছে। সেই পাইপের মুখে ময়লা জমে পানি চলাচল বন্ধ। ফলে শীতলক্ষ্যার সঙ্গে কংসের সংযোগ নেই বললেই চলে। অথচ এখান থেকেই কংসের মূল স্রোতধারা প্রবাহিত হতো।
অন্যদিকে দক্ষিণে কংস যেখানে বুড়িগঙ্গায় মিশেছে, সেখানেও একই অবস্থা। ফতুল্লা ডিআইটি মাঠের পাশের বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মী আবদুল আউয়াল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একসময় কংস ডিআইটি মাঠের পাশ দিয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশত। পানির গতি ছিল। ডিএনডি বাঁধ নির্মাণের পর কংস প্রবাহে প্রথম বাধা পায়। এখন বাঁধের নিচ দিয়ে যেটুকু পানি প্রবহমান আছে, তাতে কোনো নদীরই নাব্য ঠিক থাকার কথা নয়। কংসের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।’
এই দুই পরিবেশকর্মী পরামর্শ দিয়ে বলেন, কংসের আদিরূপ আনতে চাইলে এই দুই উৎসমুখ খুলে দিতে হবে।
এ বিষয়ে পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও ডিএনডি বাঁধের দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুল আউয়াল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কংসের দুই উৎসমুখ পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে পানির সঠিক প্রবাহের জন্য আমরা দুই পাশে দুটি শক্তিশালী পাম্প স্টেশন করছি। এটি হলে কংসের পাশাপাশি খালগুলোর পানিপ্রবাহ ঠিকমতো হবে।’
উধাও তিন শাখা : পাউবোর পুরনো কাগজপত্র থেকে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে কংশের তিনটি শাখা নদীর খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি ফতুল্লার কুতুবপুরের মাঝামাঝি মূল নদী থেকে বেরিয়ে ফতুল্লার মধ্য দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পুল হয়ে শীতলক্ষ্যায় গিয়ে মিশেছে। আরেকটি শাখা ফতুল্লার ডিআইটি মাঠ ও কুতুবপুরের মাঝামাঝি মূল নদী থেকে বেরিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে মাজদাইর গুদারাঘাট দিয়ে কালাপানির বিলে গিয়ে মিশেছে। কালাপানির বিল বুড়িগঙ্গায় মিশেছে। এ ছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জের শীতলক্ষ্যার যে অংশে কংসতে মিশেছে, সেখানে নদীটির আরেকটি শাখার খোঁজ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এখানে শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মাঝ দিয়ে কংসের একটি শাখা ছিল। এখন যেটা চনপাড়া, দেশ স্বাধীনের আগে সেটাই ছিল কংস নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।
এই তিন শাখার মধ্যে কংস নদীর কুতুবপুর থেকে যে শাখাটি সিদ্ধিরগঞ্জ পুল হয়ে শীতলক্ষ্যায় মিশেছিল, সেটি এখন আর নেই। সিদ্ধিরগঞ্জের পুল পাড়ে কথা হয় পাইনাদী গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী লোকমান আলীর সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় শাখা নদীটি দেখেছি। বড় খালের মতো ছিল। এখন সেটি নেই। বাড়িঘর উঠে বেশির ভাগই দখল বিলীন হয়ে গেছে। কয়েকটা জায়গায় ছোট ছোট জলাশয় হয়েছে।’
যে শাখাটি ফতুল্লা ডিআইটি মাঠ ও কুতুবপুরের মাঝ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের মাজদাইর গুদারাঘাট হয়ে বুড়িগঙ্গায় মিশেছিল, সেই শাখাটির এখন আর কোনো অস্তিত্বই নেই। এখন সেখানে চার-পাঁচ তলা বাড়ি হয়েছে। গুদারাঘাটের মাঝি ষাটোর্ধ্ব নেয়ামত আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩০ বছর আগেও আমি শাখা নদী দেখছি। ডিএনডি বাঁধের পরও শাখাডা আছিল। ধীরে ধীরে নদীর জায়গা দখল কইরা ঘরবাড়ি উঠছে। প্রথম শহর হয় গুদারাঘাটে। মুখ বন্ধ হইয়া যায়। এখন তো আর কিছুই নাই।’
পরিবেশকর্মী ইয়াকুব আলী জানান, কংস নদীর যে শাখা শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ছিল, সেই চনপাড়ার শাখাটি নিশ্চিহ্ন হয় স্বাধীনতার পরপরই। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর কংসের শাখা নদীটি ভরাট করে চনপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য একটা আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়। সেখানে প্রত্যেকের জন্য ঘর তৈরি করা হয়। তবে এখন আর সেটি আশ্রয়কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নেই। চনপাড়ায় অনেক ঘরবাড়ি হয়েছে। লোকালয় গড়ে উঠেছে। এখানে যে এক সময় কংসর শাখা ছিল, তা এখন আর লোকে জানেই না।
মোট খাল ২৩৯, আছে মাত্র ২০ : কংস নদীর কাছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে একসময় ৯টি শাখা খাল, ২১০টি আউটলেক ও ১০টি নিষ্কাশন খাল ছিল। এসব খালের দৈর্ঘ্য ছিল ১৮৬ কিলোমিটার। খরা মৌসুমে জমিতে পানি সেচ দিতে ও বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন করতে সরকার খালগুলো তৈরি করে। ১৯৮৮ সালের পর থেকে সেই খাল কমতে কমতে এখন এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯৪ কিলোমিটারে। এসব খালের মধ্যে পাউবো মাত্র ৩৬টি খালের সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ২০টি খালের দখল নিতে পেরেছে সংস্থাটি। বাকি ১৯৩ খালের কোনো অস্তিত্বই নেই।
এ বিষয়ে পাউবো খাল জরিপের কার্যসহকারী মশিউর রহমান বলেন, ‘এগুলোর দলিলপত্র আমাদের কাছে নেই। মৌজার নকশা অনুযায়ী খুঁজে পাচ্ছি না।’
পাউবোর কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, হারিয়ে যাওয়া খালগুলোর মধ্যে অন্তত ১০টি উদ্ধার করা সম্ভব। এগুলো হলো রঘুনাথপুর জোড়া ব্রিজের কাছে হিন্দুপাড়া, মাতুয়াইল শিশু হাসপাতাল সড়কের পাশে, ফতুল্লা ডিআইটি মাঠের পাশে ফতুল্লা খাল ও পাগলা দেলপাড়ায় পাগলা খাল, সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়িতে ঘোড়ামারা খাল, শিকদার বাড়ি খাল, গিরিধারা খাল ও নিশ্চিন্তপুর খাল। এসব খালের দৈর্ঘ্য ৭ কিলোমিটারের বেশি।
কর্র্তৃপক্ষের ভাষ্য : পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও ডিএনডি বাঁধের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুল আউয়াল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাঁধের ভেতর ৩৬ খাল ও কংস নদীর ১ কিলোমিটার পেয়েছি। বাকি অংশ সরকারি খালের মধ্যে। সেগুলোর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ চলছে। বর্জ্য পরিষ্কার করে নদী ও খালগুলো চালু করা হবে। খালের পাশে ওয়াকওয়ে তৈরি হচ্ছে, যাতে খালের জায়গা দখল না হয়। তবে এসব দখল উচ্ছেদ করতে গিয়ে গত ছয় মাসে আদালতের ২৭টির মতো স্থগিতাদেশ এসেছে। এর নিষ্পত্তি না হলে উদ্ধার কাজ সম্ভব না।’
পাউবোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে ২০টি খাল চিহ্নিত করা গেছে, এর মধ্যে অধিকাংশের ক্ষেত্রেই আদালতের নির্দেশনা থাকায় উদ্ধারকাজ থেমে আছে। বিশেষ করে কংস উদ্ধারের ক্ষেত্রে তেমন কোনো কাজ নেই এই প্রকল্পে।