সিল মারা ‘ব্যালট’ নিয়ে মৈত্রী হলে তুলকালাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কুয়েত-মৈত্রী হল থেকে গতকাল সোমবার সকালে বস্তাভরা সিলযুক্ত ব্যালট উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় নির্বাচনের শুরুতেই ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। উদ্ধার হওয়া সহস্রাধিক ব্যালটে হলটির ছাত্রলীগের প্যানেলে হল প্রভোস্টের সহযোগিতায় সিল মারা হয়েছে বলে দাবি করেন উদ্ধারকারী ছাত্রীরা। তবে ছাত্রলীগের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্যালটগুলো বের করে আনা হয়েছে, যেগুলো ভুয়া। এ ঘটনায় হলটির ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শবনম জাহানকে অব্যাহতি দিয়ে ডিজেস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীনকে তাৎক্ষণিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আবারও ভোটগ্রহণ শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ।

ব্যালট উদ্ধারকারী কয়েকজন ছাত্রী জানান, ডাকসু নির্বাচন সকাল ৮টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই শূন্য ব্যালট বাক্স দেখতে না দেওয়া পর্যন্ত ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে না বলে দাবি তুলে কেন্দ্রে অবস্থান নেন ভোটার ও প্রার্থীরা। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে হলটির প্রভোস্ট শবনম জাহানকে শূন্য ব্যালট বাক্স দেখানোর জন্য বারবার চাপ দিতে থাকেন ছাত্রীরা। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রব্বানী এবং উপ-উপাচার্য আবদুস সামাদকে প্রভোস্ট ফোন করে ডেকে আনেন। একপর্যায়ে প্রক্টর ও প্রভোস্ট ছাত্রীদের ব্যালট বাক্স দেখাতে রাজি হলেও কেন্দ্রের ভোট কক্ষের দরজা লাগিয়ে দেন। এর প্রায় ২৫ মিনিট পার হলেও দরজা না খোলায় শিক্ষার্থীদের সন্দেহ হয় এবং দরজা জোরে ধাক্কা দিলে তারা দেখতে পান, কক্ষের পেছনের দরজা দিয়ে ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রার্থী পাশের কক্ষে বস্তায় কিছু একটা সরিয়ে ফেলছেন। এমন সময় ছাত্রীরা দৌড়ে গিয়ে বস্তাটি উদ্ধার করলে তাতে দেখা যায়, ছাত্রলীগের প্যানেলে সিল মারা প্রায় সহস্রাধিক ব্যালট।

ওই ছাত্রীরা আরও জানান, সকাল ৯টার দিকে এই বস্তাভরা ব্যালট উদ্ধার করে হলটির গেটে থাকা সাংবাদিকদের সামনে তারা তুলে ধরেন। ওই সময় তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা সিলযুক্ত ব্যালট হাতে উঁচিয়ে বিক্ষোভ করেন ও ছাত্রলীগের ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন।

ব্যালট উদ্ধার করে আনা হলের ছাত্রী নাসিমা রহমান অভিযোগ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হল প্রভোস্টের সহযোগিতায় ছাত্রলীগ এই সিল মেরেছে। আর এতে সমর্থন দিয়েছেন প্রক্টর গোলাম রব্বানী এবং উপ-উপাচার্য আবদুস সামাদ। কারণ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ব্যালট বাক্স দেখাতে রাজি হয়েও কক্ষের দরজা বন্ধ করে ভেতরেই অবস্থান করছিলেন প্রক্টর গোলাম রব্বানী।’

ওই সময় হল থেকে বের হতে চাইলে ছাত্রীদের বাধার মুখে পড়েন প্রক্টর গোলাম রব্বানী ও উপ-উপাচার্য আবদুস সামাদ। তারা ভোট কারচুপিতে সমর্থন করেছেন অভিযোগ তুলে ছাত্রীরা সেøাগান দেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন, ছাত্রলীগের ব্যানারও ছিঁড়ে ফেলেন।

অধ্যাপক সামাদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে এখানে এসেছি। এখানে যে ঘটনা ঘটেছে, তা খুবই ন্যক্কারজনক। চিফ রিটার্নিং অফিসার ভোট স্থগিত করেছেন। বেলা ১১টায় ভোটগ্রহণ আবার শুরু হবে। আর এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

এদিকে ব্যালটে সিল মারায় সমর্থনের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর গোলাম রব্বানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যদি সমর্থনই করতাম, তাহলে এখানে ছুটে আসতাম না। এসে যখনই দেখলাম এভাবে ব্যালটে সিল মারা হয়েছে, তখনই আমরা রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়েছি, ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।’ এই সিল তাহলে কারা মেরেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিই উদ্ধার করবেন কারা এর সঙ্গে জড়িত।’

ডাকসু নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ও ছাত্র ইউনিয়ন নেতা লিটন নন্দী বলেন, ‘এই সিল ছাত্রলীগ যে মেরেছে, তা প্রমাণ হয়ে গেছে। রোকেয়া হলেও একই ঘটনা ঘটেছে। এই হল দুটির ঘটনাই বলে দেয়, অন্যান্য হলেও একই ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, নকল লাইন তৈরি করে ভোটারদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আর কুয়েত মৈত্রী হলের এই ঘটনার সঙ্গে হল প্রভোস্ট সরাসরি জড়িত। এছাড়া প্রক্টর এবং কয়েকজন শিক্ষক জড়িত, এটার সহযোগিতা করেছেন। ফলে আমরা নির্বাচন বর্জন করে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়েছি, কঠোর আন্দোলনেও নামার ঘোষণা দিয়েছি।’

ছাত্রলীগের প্যানেলে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী ও সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘কুয়েত মৈত্রী হল থেকে গতকাল সকালে যে ব্যালটগুলো বের করে সাংবাদিকদের দেখানো হয়েছে, সেগুলো আসল নয়, ভুয়া। ভুয়া ব্যালটে ছাত্রলীগের প্যানেলে সিল মেরে সেগুলো উদ্ধারের নাটক মঞ্চস্থ করে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। ছাত্রলীগকে জয়যুক্ত করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এর জবাব দিয়েছে।’