অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়গুলোতে (সিএজি) দুর্নীতির ৩৩টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব দুর্নীতি নিরসনে ২১ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে সিএজিতে দুর্নীতিসংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের করা এই অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করেন।
প্রতিবেদন হস্তান্তরের পর মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে মোটা দাগে ৩৩টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব নিরসনে ২১ দফা সুপারিশও রয়েছে। অর্থমন্ত্রী দুদকের এই কাজকে স্বাগত জানিয়েছেন।’
দুদক সিএজির যেসব খাতে দুর্নীতি চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন কর্মস্থলে যোগদানের পর হিসাবরক্ষণ দপ্তর কর্র্তৃক শেষ বেতনপত্র (এলপিসি) নতুন কর্মস্থলে প্রেরণের ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটিয়ে অর্থ আদায়, অবসরে গেলে সিএজি কর্র্তৃক শেষ বেতনপত্র (ইএলপিসি) ইস্যুর ক্ষেত্রে বিলম্ব ঘটানো, সার্ভিস স্টেটমেন্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে হয়রানি, কর্মচারীদের সার্ভিসবুক ভেরিফিকেশনে অর্থ আদায়, সিলেকশন গ্রেড/টাইম স্কেলে বেতন নির্ধারণের বেলায় এবং বেতন নির্ধারণের পর এরিয়ার বিল দাখিল করা হলে অনিয়মিতভাবে আর্থিক সুবিধা আদায়, পে-ফিক্সেশনের বেলায় ঘুষ আদায়, ভবিষ্যৎ তহবিল (জিপিএফ) হিসাব খুলতে অর্থ আদায়, জিপিএফ অগ্রিমের টাকা তোলায় ঘুষ আদায়, জিপিএফ হিসাব থেকে চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে ঘুষ আদায়, সরকারি বিভিন্ন অগ্রিম যথা গৃহনির্মাণ, গাড়ি, মোটরসাইকেল ও কম্পিউটার বিলের টাকা পেতে ঘুষ আদায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ কর্মচারীদের পেনশন সংক্রান্ত আনুতোষিক (গ্র্যাচুইটি) প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘুষ আদায়, ভ্রমণ ভাতার বিল পরিশোধে অর্থ আদায়, আনুষঙ্গিক ও অন্যান্য খাতের বিল পরিশোধে ঘুষ আদায়, শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বিল উত্তোলনে ঘুষ আদায়, বিল দাখিলের ক্ষেত্রে টোকেন প্রদানের সময় হয়রানি, সরকারি চাকরিতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রথম বেতন বিলের টাকা প্রাপ্তিতে ঘুষ আদায়, ভুয়া পেনশন-সংক্রান্ত বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া ভ্রমণ ভাতা বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ।
এ ছাড়াও রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প হতে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ঘুষ আদায়, সরকারি দপ্তরগুলোতে ক্রয় খাতে অনিয়মসমূহের ওপর যথাযথ প্রি-অডিট আপত্তি প্রদান না করে ঘুষ নিয়ে বিল পাস, সরকারি দপ্তর কর্র্তৃক সম্পদ সংগ্রহ বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট/আইটি/কাস্টমস ডিউটি কর্তন না করে সরকারি রাজস্ব আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে প্রতিবন্ধকতা ও হয়রানির মাধ্যমে ঘুষ আদায়।
এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক যেসব সুপারিশ করেছে তার মধ্যে রয়েছে সিজিএ কার্যালয় কর্র্তৃক মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় ভিডিও কনফারেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার জোরদার করা, সিজিএ কার্যালয়গুলোতে জনবল বৃদ্ধি, আইটি সেক্টরকে শক্তিশালী করা, প্রতিটি হিসাবরক্ষণ অফিসে একজন করে আইটি এক্সপার্ট পদায়ন করা, সমগ্র অফিস অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা, সব ধরনের বিল ইলেক্টরিক্যালি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, পেপারলেস সাইবার আর্কাইভ চালু, সিজিএস অফিসের ওয়েবসাইটে অভিযোগ দেওয়ার পদ্ধতি চালু এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সহজীকরণ।