আজ ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক কিডনি দিবস। এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে সুস্থ কিডনি সবার জন্য। বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। ১৯৫৪ সালে মানবদেহে প্রথম কিডনি সংযোজন শুরু হয়। বাংলাদেশে প্রথম কিডনি সংযোজন হয় ১৯৮২ সালে। প্রতিবছর ২৪ লাখ মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে ১ কোটি ৩০ লাখ লোক আকস্মিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিবছর। বাংলাদেশে ২ কোটির বেশি লোক কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। যার মধ্যে নারীর সংখ্যাই ১ কোটির ওপর। এসব রোগীর মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষের কিডনি বিকল হচ্ছে। বিনা চিকিৎসায় মারা যায় ৯০ শতাংশ মানুষ। দেশে বিশেষজ্ঞ কিডনি চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। প্রতি ১২ লাখ রোগীর জন্য রয়েছেন একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, খাদ্যে বিষক্রিয়াই যার প্রধান একটি কারণ। কিডনিজনিত রোগের ওষুধের মূল্য আকাশচুম্বী, চিকিৎসা ব্যয় জনগণের নাগালের বাইরে থাকায় দেশে শতকরা ১০ জন রোগী এ চিকিৎসা চালাতে পারে। ফলে বিনা চিকিৎসায় মারা যায় ৯০ শতাংশ মানুষ। এ ছাড়া যে হারে এ রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই হারে বাড়ছে না প্রয়োজনীয় ডায়ালাইসিস সেন্টার।
একটি বেসরকারি হাসপাতালে কিডনি বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট, অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, কিডনি রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই দেশে। পুরনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, দেশের ২ কোটির ওপরে কিডনি রোগী রয়েছে। এদিকে দেশের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের ওপরে নারী। আর পুরুষের চেয়ে নারীরাই এ রোগে আক্রান্ত হয় বেশি। তাই বলা যায়, দেশে ১ কোটির বেশি কিডনি রোগী নারী। তিনি আরও বলেন, কিডনি রোগে তুলনামূলকভাবে পুরুষদের চেয়ে নারীরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে কিডনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত।
তিনি আরও বলেন, দেশে কিডনি রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক অপ্রতুল। বিশেষজ্ঞ কিডনি চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১৩০ জন। এসব চিকিৎসক যদি প্রতিদিন ৭০০ রোগী দেখেন, তাহলে বছরে একজন রোগী চিকিৎসক দেখাতে পারবে।
কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন-অর রশিদ জানান, দেশে ব্যাপকসংখ্যক কিডনি রোগীর তুলনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার খুবই কম বলে দেশে মাত্র ১৪০টি সেন্টার থেকে ২০ শতাংশ রোগী ডায়ালাইসিস সেবা পেয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ৮০ শতাংশই রয়েছে রাজধানীতে। এ কারণেই দেশের সব জেলায় এ চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া প্রাইভেট হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিসের যে খরচ তা সবার পক্ষে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
ডা. হারুন-অর রশিদ আরও জানান, কিডনি রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলোÑ প্রথম দিকে এর কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে ততক্ষণে কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হয়ে পড়ে। কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করলে তা অনেকাংশেই নিরাময় করা সম্ভব।
কিডনি রোগের কারণ
কম পানি পান করা, অতিরিক্ত সোডিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, প্রস্রাব চেপে রাখা, অতিরিক্ত কফি পান করা, ধূমপান ও মদ্যপানে এ রোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। ঘন ঘন কিডনিতে ইনফেকশন, ধূমপান, স্থূলতা, পাথরজনিত রোগ, তীব্র বেদনানাশক ওষুধ সেবন, অলস জীবনযাপন ও অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক এ রোগের উল্লেখযোগ্য কারণ।
তবে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে এ রোগে মৃত্যুঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই এই ঘাতকব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনের নিয়ম মেনে চলা। কার্বোহাইড্রেট কিডনি রোগীর জন্য ভালো। ভাত, ময়দা, রুটি, চিড়া, সুজি, চালের গুঁড়া, চালের রুটি, সাগু, সেমাই ইত্যাদি কিডনি রোগীদের জন্য উত্তম কার্বোহাইড্রেট। বায়ুদূষণ ও খাদ্যদূষণ এই দুইটার প্রতি গুরুত্ব দিলে কিডনি রোগ প্রতিরোধের পথ অনেকখানি এগিয়ে যাবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।