রোহিঙ্গা সংকটে এনজিওদের তৎপরতা

নিজেদের পেছনে খরচ ৭৫% হোটেল ভাড়াই ১৫০ কোটি

আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পেছনে কাজ করা বেশ কয়েকটি এনজিও আবাসিক হোটেল ভাড়াই পরিশোধ করেছে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা। এমনকি বিদেশ থেকে আসা অর্থের ৭৫ ভাগই নিজেদের পেছনে খরচ করেছে ওইসব এনজিও। মাত্র ২৫ ভাগ অর্থ তারা খরচ করেছে রোহিঙ্গাদের পেছনে। গতকাল বুধবার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির প্রথম বৈঠকে এ বিষয়টি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কমিটির সভাপতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, এনজিওরা বিদেশ থেকে যে অর্থ আনছে সেটি রোহিঙ্গাদের কল্যাণে ব্যয় করছে না। ২৫ শতাংশও রোহিঙ্গাদের জন্য খরচ করেনি তারা। দেখাশোনা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৭৫ ভাগ। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত

 এনজিওগুলো তাদের বিদেশি প্রতিনিধিদের জন্য আবাসিক হোটেলের বিলই দিয়েছে দেড়শ কোটি টাকার মতো। ফ্ল্যাট ও বাড়ি ভাড়া দিয়েছে ৮ কোটি টাকারও বেশি। এটা খুবই দুঃখজনক।

তিনি বলেন, তাদের আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব এনজিও এভাবে টাকা খরচ করেছে তাদের চিহ্নিত করা হবে। পরে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে।

বৈঠকে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দেশকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করতে আরও জোরালো অভিযান চালানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণ করতে বলার সিদ্ধান্ত রয়েছে। বৈঠকে সম্প্রতি চট্টগ্রামে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের চেষ্টা ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অস্ত্র নিয়ে প্রবেশের ঘটনায় উদ্বেগ জানানো হয়। পাশাপাশি দেশের সব বিমানবন্দরে কঠোর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব যাত্রীর শরীর, লাগেজ, জুতা, মোজা ও বেল্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া সুষ্ঠুভাবে সংসদ নির্বাচন করায় বৈঠকে পুলিশ-র‌্যাবসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ধন্যবাদ জানানো হয়।   

বৈঠকে উপস্থিত পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদক প্রতিরোধে আগামী ৪ এপ্রিল ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের ৩২টি সীমান্ত এলাকার সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করবেন। কারাগারে থেকে নতুন করে যাতে কোনো জঙ্গি সৃষ্টি না হয় সেদিকে নজর দেওয়া হবে। ঢাকার ১৫০টি বাসস্টপেজের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কারণ সেগুলো নিয়মিত ব্যবহার করে না যানবাহন চালকরা। যেখানে-সেখানে তারা গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী উঠানামা করায় দুর্ঘটনা ও যানজট বাড়ছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বৈঠকে মাদকের বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। দেশের কারবারিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গারাও দেদার মাদক কারবার চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে বলা হয়েছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদ, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মো. শহিদুজ্জামানসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 

কমিটির সভাপতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের কোথায় রাখা হবে সেটি সরকারের নিজস্ব ব্যাপার। সেই হিসেবে বিদেশি সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের মানবিক বিষয়গুলো দেখতে পারে। এজন্য তাদের মতামত থাকলে সরকারকে জানাবে। তারপর সরকার সেটি বিবেচনা করবে। দ্রুত স্থানান্তর করতে সরকার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। তারপরও সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা যাতে কোনো নাশকতা চালাতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোরভাবে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। মাদকদ্রব্য পাচার বন্ধে তারা সফলতার সঙ্গে কাজ করছে।

তিনি বলেন, মাদক আসার পরিমাণ যেকোনো সময়ের চেয়ে কমেছে। সীমান্ত এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি করছেন। গত কয়েক মাসে তারা প্রচুর পরিমাণ মাদকদ্রব্য আটক করেছে। সরকার দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমটি হলো যারা মাদকদ্রব্য ব্যবহারকারী তাদের চিহ্নিত করে ধরা। দ্বিতীয়টি, নিরাময় কেন্দ্রগুলো কীভাবে আরও বাড়ানো যায় সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া। নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। তাই যারা ভালো হতে চান, তাদের চিকিৎসা যাতে নিশ্চিত করা যায় সেজন্য এগুলো বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে নজরদারি করা হচ্ছে।

ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, আগামী সভায় ঢাকার দুই মেয়রকে উপস্থিত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হবে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া ঢাকা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে এসব কাজ জড়িত রয়েছে। যৌথভাবে যেন যানজট নিয়ন্ত্রণ করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।