অসৎদের’ ব্যাংকের বোর্ডে রাখা হবে না : অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ‘ব্যাংকিং কোনো খেলার জায়গা না। যারা ব্যাংকিং বোঝে না এবং যারা অসৎ তাদের বোর্ডে রাখা হবে না। এ বিষয়ে আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি। প্রয়োজনে আরও বলব। কোনো অবস্থায় তাদের রাখা হবে না।’ গতকাল বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে জনতা ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি।

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালাক মো. আবদুস ছালাম আজাদ।

 অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে আছে। চলতি অর্থবছর শেষে ৮ দশমিক ১৫ থেকে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়াবে; যা বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। অন্যান্য খাতেও অবস্থা ভালো। কিন্তু এই মুহূর্তে সরকারের সবচেয়ে দুর্বলতার স্থান ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।’

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করে মুস্তফা কামাল বলেন, ‘লিজ ফাইন্যান্সিংয়ের নামে অনেক প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। এই লিজ ফাইন্যান্সিংয়ের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তাদের এক-দুটি বাদে বাকিদের ফোন দিয়েও অফিসে পাওয়া যায় না। এটা কিন্তু বাস্তবতা। তবে প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে প্রত্যেকটা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ অডিটের ব্যবস্থা করা হবে। এটি কাউকে বিপদে ফেলতে নয়, স্বচ্ছতার জন্য করা হবে।’ এর মধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকার দুর্নীতি শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে কাজ করছে। তাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। আমি দুদককে কথা দিয়েছি, যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলা হবে। তাই আপনারাও দুর্নীতিকে ‘নো’ বলবেন এই শপথ নেন। এই অনুষ্ঠানে সবাইকে শপথ করাচ্ছি না, পরবর্তীতে একটি অনুষ্ঠানে সকলকে ‘দুর্নীতি করব না’ শপথ করানো হবে। যারা এই শপথ নিতে পারবেন পরবর্তীতে তারা আসবেন, অন্যরা আসবেন না।”

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের কোনো পরিকল্পনা নেই জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যবসায়ীকে জেলে পাঠাব না; যদি তারা অপরাধ স্বীকার করে আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত দেয়। আর যারা ভালো ব্যবসায়ী, কিন্তু প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা প্রতিকূলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সরকার থেকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।’ তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যারা থাকবেন তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপিঋণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, এটা ভবিষ্যতে আর বাড়বে না বরং কমবে। সেজন্য আপনাদের সবার ভূমিকা ও সহযোগিতা কামনা করছি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘আমাদের এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড হতে হবে। তাহলে দেশ শিল্পায়িত হবে। এজন্য চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।’ বড় বড় প্রকল্পের অর্থায়নে জনতা ব্যাংকের অবদান প্রশংসনীয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততা নেগেটিভে রয়েছে। খেলাপিঋণ কিছুটা বেশি। এটা তাদের বড় সমস্যা। এটা কাটিয়ে উঠে শক্তিশালী অবস্থানে যেতে হবে। তবে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও রয়েছে। আমানত গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এডিআর রেশিও ১১ শতাংশের ওপরে, খেলাপিঋণ আদায় বেড়েছে (২০ শতাংশ) এবং শতভাগ শাখা অনলাইনের আওতায় এসেছে।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান অবস্থা কোথায়, ভবিষ্যতে কোথায় যেতে চান, বেস্ট সলিউশনটা আপনারা বের করুন।’

জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা সামসুদ্দোহা বলেন, ‘জনতা ব্যাংক সর্বপ্রথম সরকার ঘোষিত ঋণের সুদ ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে। এতে সামগ্রিক মুনাফা অর্জনে কিছুটা প্রভাব পড়লেও আমরা তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হচ্ছি।’ তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ৯৬৪ কোটি টাকা অর্জিত হয়েছে এবং ২০১৯ সালে ১৪০০ কোটি টাকা অর্জনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুস ছালাম আজাদ বলেন, ২০১৮ সাল শেষে জনতা ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এ সময় ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। লোকসানি শাখা একটি কমে ৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এননটেক্স গ্রুপের ঋণের কারণে ব্যাংকের খেলাপিঋণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে অর্থঋণ আদালতে আমরা মামলা করেছি এবং এননটেক্স গ্রুপের ঋণ আদায় এবং নিয়মিতকরণের লক্ষ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। আশা করছি, ২০১৯ সালে শ্রেণিকৃত ঋণ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হব।’