নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শুক্রবার সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ড আমাদের জনমনে যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে, তা খুবই স্বাভাবিক। শহরটির দুটি মসজিদে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪৯ জন নিরীহ মুসলিম, যার মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি। দুটি ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যেও কয়েকজন বাংলাদেশি আছেন। আরও গা শিউরে ওঠার মতো খবর হলো, নিউজিল্যান্ড সফররত বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট টিমের আল-নুর মসজিদে, জুমার নামাজ পড়ার কথা ছিল, যেখানে ৪১ জন নিহত হন। সেখানে তারা পৌঁছার মাত্র তিন মিনিট আগে মসজিদটিতে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলাটি ঘটে। জানা গেছে, পরদিনের টেস্ট ম্যাচ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনটি যদি ঠিক সময়ে শেষ হতো, তাহলে পুরো বাংলাদেশে আজ মাতম চলত।
দুটি ঘটনাই ঘটিয়েছে বেন্টন ট্যারান্ট নামে এক অস্ট্রেলিয়ান এবং তার তিন সহযোগী। তবে, অন্য হামলাটি ঘটিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগে, আল-নুরের ঘটনাটি সম্পর্কে খবর দিয়েছে হামলাকারী নিজেই। পুরো ঘটনাটি সে তার মাথার হেলমেটে লাগানো ক্যামেরার মাধ্যমে ভিডিও করেছে এবং এর কিছু অংশ সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারও করেছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, সে একটি সেমি অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে গুলি করতে করতে মসজিদে ঢোকে এবং মসজিদটির প্রতিটি কক্ষে গিয়ে যাকে পেয়েছে তাকেই সে গুলি করেছে। আর জুমার নামাজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত অসহায় মুসল্লিরা একের পর এক মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। আমাদের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হলো, যদি নিউজিল্যান্ড টিম আমাদের এখানে এসে কোনো চার্চে প্রার্থনার জন্য যেত, তাহলে অন্তত তিন দিন আগে থেকেই ওই চার্চের আশপাশে গোয়েন্দা নজরদারি চলত। তারপর ক্রিকেটাররা সেখানে আসার আগে আগে নিরাপত্তাকর্মীরা সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘœ ঘটিয়ে হলেও এলাকাটি ঘিরে ফেলত। কিন্তু নিউজিল্যান্ড সরকার আমাদের ক্রিকেট টিমের জন্য ওইসব ব্যবস্থার সামান্যতম অংশও নেয়নি। যদি তারা তা নিত, তাহলে অন্তত আল-নূরের হত্যাকা-টি ঠেকানো যেত।
শুধু কি তা-ই? নিজেকে একজন শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী (হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট) বলে দাবি করা ট্যারান্ট বহু আগেই তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশাল এক ইশতেহার প্রকাশ করে এ রকম একটা ঘটনা ঘটানোর ঘোষণা দিয়েছিল। সেখানে সে দাবি করেছিল, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো শ্বেতাঙ্গদের; সেখানে অশে^তাঙ্গ অভিবাসীরা, বিশেষ করে মুসলিমরা, নাকি ‘আগ্রাসন’ চালাচ্ছে। এ ‘শে^তাঙ্গভূমি’ ‘পুনরুদ্ধার’ করার জন্য তার সঙ্গে যোগ দিতে সেসব শে^তাঙ্গকে আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে ‘সদাসচেতন’ নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া সরকার এগুলোকে পাত্তা দেয়নি। তাই ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকা-ের দায়, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী যতই ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী ঘটনা আখ্যা দিয়ে এর হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর বাণী উচ্চারণ করুন না কেন, তিনি ও তার প্রতিবেশী দেশটির সরকার এড়াতে পারেন না। নিউজিল্যান্ডে এমন সন্ত্রাসী ঘটনা বহু বছরের মধ্যে প্রথম ঘটলেও, দেশটি এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে সচেতন ছিল না তা কিন্তু নয়। পুরো দুনিয়াতেই কয়েক দশক ধরে ইসলামের নামে নানা ধরনের প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা চলছে এবং এসব হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু শে^তাঙ্গরা। নিউজিল্যান্ড সরকার ভালো করেই জানে এ ধরনের সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার শঙ্কা থেকে তারাও মুক্ত নয়। এ কারণে ইউরোপীয় ভাই-বেরাদরদের মতো, ‘ইসলামি’ সন্ত্রাস ঠেকানোর জন্য, তাদের নিরাপত্তারক্ষীরা বেশ সচেতন বলেই আমরা জানি।
কিন্তু এটাও সত্য, শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা শুক্রবারই প্রথম আত্মপ্রকাশ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গত এক দশকে যত সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে, তার ৯০ শতাংশেরও বেশির সঙ্গে জড়িত ছিল অমুসলিমরা বা শে^তাঙ্গরা। মুসলিম কোনো সংস্থা নয়, শে^তাঙ্গশাসিত সন্ত্রাসী ঘটনা পর্যবেক্ষণকারী একাধিক সংস্থা এ তথ্য জানিয়েছে। নিউজিল্যান্ডের মতোই
শান্তিবাদী একটি দেশ ইউরোপের নরওয়ে। সেখানে ২০১১ সালে ব্রেইভিক নামের যে হত্যাকারী একটি যুব উৎসবে হামলা চালিয়ে ৭৮ জনকে হত্যা করেছিল, সেও ছিল একজন ‘শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী’। তা ছাড়া, পুরো ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অপশক্তির যে উত্থান ঘটেছে এবং তারা যে প্রধানত অভিবাসীদের, বিশেষ করে মুসলিমদের, তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঠিক করেছে, তা নিয়ে দেশগুলোর জনগণের বিভিন্ন অংশকে, এমনকি কোনো কোনো দেশের সরকারকেও, উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হলেন, তা-ও তো এরই একটা উৎকট বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু দুঃখজনক হলো, ট্রাম্পের উত্থানের কারণে ইউরোপের অনেক দেশের উদারনৈতিক বলে পরিচিত নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করলেও তার উগ্র-অনুসারীদের ঠেকাতে তারা খুব একটা তৎপর হননি।
আগেই বলা হয়েছে, নিউজিল্যান্ড হলো একটা শান্তিবাদী দেশ। সেখানে ১৬০-এরও বেশি ভাষাভাষী মানুষের বসবাস। নানা ধর্মের অভিবাসীদের কাছে দেশটি একটি নিরাপদ আশ্রয় বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। মুসলিমরাও সেখানে বেশ শান্তিতেই বসবাস ও কাজকর্ম করতে পারেন বলে সবার ধারণা। এত কিছুর পরও, দেশটির সরকার যে শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সম্পর্কে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই তার দায়িত্ব শেষ করেছে, এদের কাছ থেকে আসা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর সম্ভাব্য হামলার হুমকির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, শুক্রবারের হৃদয়বিদারক ঘটনাবলি তারই প্রমাণ। দেশটির সরকারকে মনে রাখতে হবে, অবিলম্বে এর একটা গ্রহণযোগ্য সুরাহা না হলে, ক্রাইস্টচার্চের এ ঘৃণ্য ঘটনাবলি অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত দেশটির জনগণকে বিভক্ত করে দেবে, যার পরিণামে সামনের দিনগুলোতে হয়তো এ ধরনের আরও ঘটনা ঘটবে।
তবে আমরা যারা ক্রাইস্টচার্চের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছি এবং এ সুযোগে খ্রিস্টান-ইহুদি জঙ্গিবাদের মু-পাত করছি, যদিও শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ আর খ্রিস্টান-ইহুদিবাদী জঙ্গিবাদের মধ্যে বেশ ভালো ধরনের পার্থক্য রয়েছে এবং ট্যারান্ট নিজেও খুব একটা ধর্মবাদী বলে দাবি করেনি, তাদেরও কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে। হিংসায় হিংসা আনে, এটা একটা শাশ^ত সত্য। আজকে যারা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিমশাসিত দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সা¤্রাজ্যবাদী হামলার জবাব দিতে গিয়ে ওই দেশগুলোর নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে, তারাই ব্রেইভিক বা ট্যারান্টের মতো অপশক্তির উত্থানে সহায়তা করছে। এত চূড়ান্ত বিচারে কার লাভ হচ্ছে? ওই সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসী শক্তিই এ থেকে ফায়দা লুটছে। কারণ প্যারিস, লন্ডন, স্টকহোম বা নিউ ইয়র্কে তথাকথিত ইসলামি জঙ্গিবাদী হামলাকে দেখিয়েই ওরা ওই দেশগুলোর জনগণকে বিভক্ত করছে এবং নিজেদের ভুল পলিসির কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সমস্যার দায় অভিবাসীদের ওপর চাপিয়ে নিজেদের তবিয়ত বহাল রাখছে।
ট্যারান্ট যে রাইফেলটি ব্যবহার করেছে, তাতে একটি শিশুর নাম লেখা ছিল, যে শিশুটি ২০১৭ সালের এপ্রিলে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে এক উজবেক জঙ্গির ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হয়েছিল। ট্যারান্ট দাবি করেছে, ক্রাইস্টচার্চের হামলার পেছনে ওই শিশু হত্যার বদলা নেওয়ার বিষয়টিও কাজ করেছে। স্মরণ করা যেতে পারে, আল-নুর মসজিদেও দুটি শিশু ঘাতকের হাতে জীবন দিয়েছে। কিন্তু এটা তো অনস্বীকার্য, স্টকহোমের ওই শিশুটি যেমন ইরাক, সিরিয়া বা অন্য কোনো দেশে মুসলিম নিধনের সঙ্গে জড়িত ছিল না, তেমনি ক্রাইস্টচার্চের শিশু দুটিও কোনো শ্বেতাঙ্গ হত্যার জন্য দায়ী নয়। কিন্তু ঘৃণা এমনই অন্ধ করেছে দুই পক্ষের সন্ত্রাসী বা জঙ্গি দলকে, এসব কথা ভাবার সময় তাদের নেই।
আরেকটা কথা। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপ শে^তাঙ্গদের, ট্যারান্টের এমন দাবিকে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পৃথিবীতে একটা সময় ছিল যখন জাতিরাষ্ট্র বলে আজকে যা বোঝায়, তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ধারণাটিও জোরালো ছিল না। ফলে, পাসপোর্ট-ভিসারও কোনো প্রচলন ছিল না। এ কারণে একটা সময় পর্যন্ত এক রাজ্যেও মানুষ বিনা বাধায় অন্য রাজ্যে চলে যেত। কিন্তু একটা সময় এসেছে যখন থেকে সব রাষ্ট্র একদিকে জাতীয়তার ভিত্তিতে তার পরিচয় ঠিক করছে, আরেক দিকে নিজস্ব সীমানাকে শুধু নির্দিষ্টই নয়, সুরক্ষিতও করেছে। সেখান থেকেই অভিবাসনের বিষয়টিও নিয়ন্ত্রিত হয়ে চলেছে। তাই কোনো জাতি-রাষ্ট্রের মূল অধিবাসীরা যদি সে দেশে অভিবাসী অনুপ্রবেশ বন্ধের দাবি তোলে, তাতে আপত্তি করার কিছু নেই। কিংবা সে দেশের সরকার যদি অভিবাসী নিয়ন্ত্রণে আইনি পদক্ষেপ নেয়, তা-ও সবার মেনে চলাই সংগত। এমনকি এ যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো যেহেতু অভিবাসীদের নিয়েই গঠিত হয়েছে, তাই এখনো সেখানে অভিবাসীদের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকতে হবে। কারণ রাষ্ট্রগুলো আজকে যে পর্যায়ে আছে, সেখানে আসার পেছনে শে^তাঙ্গরাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এটাও সত্য, উন্নত দেশগুলোয় যেসব অভিবাসী আছেন, তাদের বেশির ভাগ নিয়ম মেনেই সেখানে আছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, দেশগুলো আজকে নানা কারণে যে জনবল সংকটে পড়েছে, যা তাদের অর্থনীতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে, তা মোকাবিলার জন্যই তাদের সরকারগুলো অভিবাসীদের অনেক ক্ষেত্রে রীতিমতো আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অতএব, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে, হিংসা-হানাহানি তো নয়ই, কোনো একতরফা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নেই।
সবকিছু মিলিয়ে বলতে হয়, যদি ক্রাইস্টচার্চের মতো আরেকটা বর্বরতা ঠেকাতে হয়, তাহলে একদিকে সব রাষ্ট্রকে যেকোনো হিংসা বা ঘৃণা ছড়ানোর আদর্শ বা মতবাদকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে, আরেকদিকে জনগণকে শান্তি আর সৌহার্দ্যমূলক চিন্তার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। পারস্পরিক আলোচনাই যেকোনো সমস্যা কার্যকরভাবে সমাধানের একমাত্র পথÑ এ মূল্যবোধকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে দিতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট