জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা

নানা উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার সারা দেশে উদযাপিত হয়েছে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মবার্ষিকী। একই সঙ্গে দিনটিকে দেশব্যাপী ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও উদযাপন করা হয়েছে। বর্ণিল উৎসব ছিল সারা দেশে। স্মৃতিচারণ, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন, সমাধিতে শ্রদ্ধা অপর্ণ, নাটক-গান-আবৃত্তির মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু। শিশুরা রংতুলি দিয়ে এঁকেছেন এই মহান নেতার ছবি। ছোপ ছোপ রঙে দেয়াল সেজেছিল নানা রঙে। মাইকে বেজেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গান। ব্যক্তি আলাপচারিতা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাঙালির এই অবিস্মরণীয় মহান নেতাকে।

কাল ছিল সরকারি ছুটির দিন। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে পত্রিকাগুলো। সারা দেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশেষ সেবাদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি রোগীদের উন্নতমানের খাবার

পরিবেশন এবং সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

১৯২০ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি। আসে প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা।

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে মানুষের ঢল : বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকালে রাজধানীর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সামনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জাতির পিতার প্রতিকৃতির বেদিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের পর স্বাধীনতার এই মহান স্থপতির প্রতি সম্মান জানাতে প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে দলের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে আরেকবার পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। পরে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বর্ণিল চিত্রে সেজেছিল দেয়াল : রাজধানীর তেজগাঁও রেলক্রসিং থেকে সাত রাস্তা মোড় পর্যন্ত মেয়র আনিসুল হক সড়কের দুই পাশের দেয়াল সেজেছিল হাতে আঁকা বর্ণিল চিত্রে। আয়োজন করেছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। সকাল ১০টা থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ১৮০ শিক্ষার্থীর হাতে আঁকা ছবিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে সড়কটির দুই পাশের দেয়াল। এ সময় সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

প্রেস ক্লাব ও ডিআরইউ : বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি সাইফুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে সাংবাদিক নেতারা জাতীয় প্রেস ক্লাবে বঙ্গবন্ধু প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। এ সময় তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. মাহবুব-উল-আলম হানিফসহ সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব শাবান মাহমুদ ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি আবু জাফর সূর্যের নেতৃত্বে সংগঠনগুলো বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সদস্যের সন্তানদের নিয়ে সংগঠনের সাগর-রুনী মিলনায়তনে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের অনারারি অধ্যাপক সৈয়দ আবুল র্বাক আলভী। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ডিআরইউ সভাপতি ইলিয়াস হোসেন, সাধারণ সম্পাদক কবির আহমেদ খান, যুগ্ম সম্পাদক জামিউল আহসান সিপু ও নারীবিষয়ক সম্পাদক সাজিদা ইসলাম পারুল। প্রতিযোগিতায় বয়সভিত্তিক ‘ক’ বিভাগে ৩৫ এবং ‘খ’ বিভাগে ১৫ জন শিশু অংশ নেয়।

শিশুর ক্যানভাসে রঙের মেলা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুল তলায় ‘গৌরব ৭১’ আয়োজন করেছিল জাতীয় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। অংশ নিয়েছিল বিভিন্ন বয়সের শিশুরা। প্রতিযোগিতা শেষে তিনটি বিভাগে ৩০ প্রতিযোগীকে বিজয়ী হিসেবে এবং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সবাইকে বই ও সনদপত্র দেওয়া হয়। সংগঠনের সভাপতি মনিরুল ইসলাম মণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক।

নাটক-গান-আবৃত্তি : শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে বিকেলে বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে নাট্য সংগঠন ‘স্পর্ধা’ ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ নামে দুটি নাটকের প্রদর্শনী করে। নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। মঞ্চায়ন করে নাটক ‘মুজিব মানে মুক্তি’। বাংলা একাডেমিতে সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনো’ শীর্ষক শিশু-কিশোর অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনান কবি কাজী রোজী, শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন, কবি মিনার মনসুর, ডা. আবদুন নূর তুষার ও ডা. নুজহাত চৌধুরী। বিকেল ৫টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলোচনায় অংশ নেন কথাসাহিত্যিক রাহাত খান এবং অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সুবীর নন্দী, আলম আরা মিনু ও অনন্যা আচার্য্য।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজন করে শিশু-কিশোর আনন্দানুষ্ঠানের। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে ইউসেপ স্কুল, আগারগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এছাড়া সংগীত পরিবেশন করেন স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী নমিতা ঘোষ।

এছাড়া সকাল ১০টায় বাংলাদেশ ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার এবং ব্রেইন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে বাংলা মোটর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভাপতিত্ব করেন বিএসএমএমইউর অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আবদুল বারী। আলোচনায় অংশ নেন অধ্যাপক ডা. রাজিউল হক, অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুর রহমান, ডা. মো. শাহিদুল ইসলাম প্রমুখ। গোলাপ কুঁড়ি ফাউন্ডেশন মোহাম্মদপুরে নিজস্ব প্রাঙ্গণে আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে শিশুদের মাঝে খাতা, পেনসিল প্রদান করা হয়। প্রধান অতিথি ছিলেন খেলাঘরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মতিন ভূঁইয়া। বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক রীনা আক্তার, ঢাকা জেলার দক্ষিণ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. সাদেকুর রহমান, সাংবাদিক মাহমুদ সালেহীন খান প্রমুখ।