ক্রাইস্টচার্চে হামলা

ক্রাইস্টচার্চে হামলা মরদেহের জন্য স্বজনদের অপেক্ষা

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনার দুদিন পর মরদেহের জন্য গতকাল রবিবার দিনভর অপেক্ষা করেছেন উদ্বিগ্ন স্বজনরা।

ইসলামী রীতি অনুযায়ী, মৃত্যুর পরপরই গোসল করানোর পর মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা হয়। সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মরদেহের দাফন সম্পন্ন হয়। কিন্তু আধুনিক নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে ন্যক্কারজনক এ হামলার ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও প্রিয়জনকে কখন দাফন করতে পারবেন, তা জানেন না স্বজনরা।

বার্তা সংস্থা এপির খবরে জানানো হয়, প্যাথলজিস্ট ও মরদেহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ভুক্তভোগীদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টার কথা জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মাইক বুশ। যত দ্রুত সম্ভব, মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়ে বুশ বলেন, ‘এটার (হস্তান্তর) আগে আমাদের মৃত্যুর কারণ সুনিশ্চিত এবং তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আমরা সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রয়োজনীয়তার কথাও জানি। তাই আমরা এটা যত দ্রুত সম্ভব এবং সংবেদনশীলতার সঙ্গে করছি।’

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জ্যাসিন্দা আরডার্ন জানিয়েছিলেন, রবিবার সন্ধ্যায় কিছুসংখ্যক মরদেহ পরিবারের হাতে হস্তান্তর করা হবে। তার আশা, আগামী বুধবারের মধ্যে সব মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে কর্র্তৃপক্ষ।

পুলিশ জানিয়েছে, তারা ভুক্তভোগীদের একটি তালিকা পরিবারগুলোর কাছে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনদের চিন্তা কিছুটা কমতে পারে।

এদিকে নিহত ব্যক্তিদের দাফনে সহায়তা করতে বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রাইস্টচার্চে ছুটে গিয়েছেন পরিচিত কিংবা স্বজনরা। ওই এলাকার গোরস্তানে কবর খোঁড়ার যন্ত্র পাঠিয়েছে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ। নতুন করে সেখানে বেড়া দেওয়া হয়েছে।

দুই মসজিদে হামলাকারী ২৮ বছর বয়সী ব্রেন্টন হ্যারিসন ট্যারান্টকে গত শনিবার কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। ওই সময় তার হাতে হাতকড়া, গায়ে সাদা কয়েদিদের জামা ছিল। আদালতে বিচারক হত্যায় অভিযুক্ত করার সময় তাকে কোনো অনুভূতি প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। বিচারক জানান, তাকে আরও অভিযোগে অভিযুক্ত করা হতে পারে।

শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ট্যারান্ট হামলার আগে ৭৪ পৃষ্ঠার একটি নথি অনলাইনে প্রকাশ করেন, যা অভিবাসীবিদ্বেষী বক্তব্যে ঠাসা। বন্দুক দিয়ে হামলার সময় হেলমেটে আটকানো ক্যামেরা দিয়ে ঘটনাটি সরাসরি ফেইসবুকে প্রচার করেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জানান, হামলার ৯ মিনিট আগে বন্দুকধারী তার কার্যালয়ের ইমেইলে নথিটি পাঠায়। যদিও নথিটি সরাসরি পাননি তিনি। তিনি আরও বলেন, তার কার্যালয়সহ আরও ৩০ জায়গায় সে নথি পাঠানো হয়। সে নথিগুলো পার্লামেন্টের নিরাপত্তা কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয় কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

পুলিশ কর্মকর্তা বুশ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ভুক্তভোগীদের উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার আগে তারা আল নুর মসজিদে আরেকটি মরদেহ পেয়েছেন। এ নিয়ে ওই মসজিদে নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ৪২ জনে। অন্য সাতজন নিহত হন ক্রাইস্টচার্চের উপকণ্ঠ লিনউড মসজিদ এলাকায়। অপরজনের মৃত্যু হয় ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালে।

এ ঘটনায় আহত ৩৩ জন ক্রাইস্টচার্চ হাসপাতালে ভর্তি আছে। তাদের মধ্যে ১২ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মকর্তারা। অকল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন চার বছর বয়সী একটি শিশুও সংকটাপন্ন।

হাসপাতালের কাছাকাছি রাস্তায় একটি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ভুক্তভোগী, পরিবার ও বন্ধুদের জন্য করা এ কেন্দ্রে জড়ো হন তাদের প্রতি সমব্যথী অনেক লোক। অনেকে নিউজিল্যান্ডের দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন শোক প্রকাশ করতে।

সহায়তা করতে আসা ব্যক্তিদের একজন অকল্যান্ড থেকে ছুটে আসা ৫৬ বছর বয়সী আবদুল হাকিম। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর পরপরই আমাদের অবশ্যই লোকজনকে কবর দিতে হবে। আমরা এসেছি তাদের (স্বজন) মরদেহের গোসল ও দাফনে সাহায্য করতে।’

৩৫ বছর বয়সী ভাই জুনায়েদ মোরতারার মৃত্যুর খবর শুনে অকল্যান্ড থেকে ক্রাইস্টচার্চে গিয়েছেন জাভেদ দাদাভাই। তিনি বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন ধৈর্যশীল ছিল।