‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার/সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার’Ñমানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক ও দার্শনিক মরমি বাউল সাঁই লালন মানবমুক্তির প্রশ্নে আজও প্রাসঙ্গিক। সাঁইজি তার গানের মধ্য দিয়ে জাতপাতহীন সমাজব্যবস্থার দর্শন দেখিয়েছেন। সমাজের ধর্মান্ধ, গোঁড়ামি, শাসকদের পক্ষপাত বিচার ও বৈষম্য দূর করার পথ দেখিয়েছেন।
সাধক ফকির লালন শাহর স্মরণে আজ বুধবার কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হচ্ছে তিন দিনের ‘দোলপূর্ণিমা স্মরণোৎসব’। এরই মধ্যে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে আসতে শুরু করেছেন শত শত লালনভক্ত ও অনুসারী। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় ও লালন একাডেমির আয়োজনে এই উৎসবের সব প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আজ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে উৎসব চলবে শুক্রবার পর্যন্ত।
জীবদ্দশায় বাউল শিরোমনি লালন সাঁই ফাল্গুনের শেষে দোলপূর্ণিমা তিথিতে গানের আসর বসাতেন। ১৮৯০ সালে তার তিরোধানের পর থেকে ভক্ত ও অনুসারীরা দোলপূর্ণিমায় কালীগঙ্গার ধারে মাজার চত্বরে স্মরণোৎসব হিসেবে গানের আসরের আয়োজন করে আসছেন। কালক্রমে এটি বাউলসাধক, শিল্পী ও সংগীতানুরাগীদের বিশাল এক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উৎসবের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আখড়াবাড়িতে আগত লালন ভক্ত-অনুরাগীদের সেবাদানে যা কিছু প্রয়োজন তার সব কিছুই প্রস্তুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার ভক্ত-অনুসারী ও উৎসুক দর্শকরা শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা করছি।’
জেলা প্রশাসক জানান, আজ সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের উদ্বোধন করবেন। এদিনসহ প্রতিদিন সন্ধ্যায় লালনের জীবনদর্শন নিয়ে হবে আলোচনা অনুষ্ঠান। এ ছাড়া প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত লালন একাডেমির ও দেশ-বিদেশ থেকে আসা খ্যাতনামা শিল্পীরা লালনগীতি পরিবেশন করবেন।
গতকাল মঙ্গলবার ছেঁউড়িয়ায় আখড়াবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাজার প্রাঙ্গণ ধুয়েমুছে পরিষ্কারের পাশাপাশি আলোকসজ্জার মাধ্যমে এক বর্ণিল পরিবেশের সৃষ্টি করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শত শত লালনভক্ত ও অনুসারী আখড়ায় জায়গা করে নিতে শুরু করেছেন। লালন একাডেমি ও মরা কালীগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে বিশাল মাঠজুড়ে মেলা বসেছে বাউলসাধুদের। আগামী কয়েক দিন এখানে অবিরাম চলবে লালনের অপূর্ব সুরমূর্ছনা। সবাই মজবে উদাসী গানে। প্রতিদিন হাজার হাজার লালনপ্রেমী আর অনুসারীদের পদচারণে মুখর থাকবে লালনের মাজার। মাজার চত্বরের পাশে বিশাল মাঠজুড়ে শতাধিক স্টলে গ্রামীণ মেলারও পসরা বসেছে।
লালনভক্তদের মতে, কোনো এক চৈত্রের দোলপূর্ণিমায় কুষ্ঠরোগী লালন কালী নদীতে ভেলায় ভাসতে ভাসতে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আসেন। এখানকার বাসিন্দা মলম শাহ তাকে উদ্ধার করে সেবা-চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তোলেন। পরে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে বেড়ে ওঠা লালন তার গুরু সিরাজ সাঁইয়ের কাছে ফকিরী দর্শন গ্রহণ করেন। লালন সাঁইজি তার গানের মধ্য দিয়ে জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থার দর্শন দেখিয়েছেন। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে থেকে মরমি সাধক বাউলসম্রাট ফকির লালন মানবমুক্তির জন্য সৃষ্টি করেছিলেন ফকিরী মতবাদ। তার মানবমুক্তির আলোকিত সৃষ্টি বাউলগান নিয়ে সারা বিশ্বের ভক্ত ও অনুরাগীরা তাকে চেনেন, জানেন ও হৃদয়ে লালন করেন। ব্যক্তি লালনের জাত-পাতের পরিচয় নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও আধ্যাত্মিক সাধক লালন শাহ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠেছেন তার মানব দর্শনালোকের দ্যুতি ছড়িয়ে।