শিক্ষার্থীরা পেরেছিল রাষ্ট্র কেন পারছে না

সড়কে আবার রক্ত ঝরল।  এর আগে যে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে ‘কিশোর আন্দোলন’ গড়ে উঠেছিল সেই দুর্ঘটনার কারণও ছিল একটি বাস কোম্পানির গাড়ি। এবারও কোম্পানির দুটি গাড়ির রেষারেষির কারণে প্রাণ হারালেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস-এর আন্তর্জাতিক বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী। আগে কিশোর আন্দোলনে দাবি উঠেছিল যে ‘দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে চালকদের গাড়ি চালাতে দেওয়া যাবে না’, ‘ভুয়া লাইসেন্সে গাড়ি চালানো যাবে না’, ‘আনফিট গাড়ি চালানো যাবে না’ ইত্যাদি। সেই সময় একটি আইনও প্রণয়ন হয়েছিল। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সেই আইন কার্যকর হয়নি।

অবাক হওয়ার মতো বিষয় যে, এই গাড়িগুলো কোনো কোম্পানির নিজস্ব নয়। এরা বিভিন্ন ব্যক্তির গাড়ি নিয়ে কোম্পানির নামে চালায়। দিনপ্রতি এরা ৭০০-১২০০ কোথাও ১৫০০ টাকা চুক্তির ভিত্তিতে গাড়িগুলো ভাড়া নেয়। এরা যেহেতু ‘দৈনিক মজুরি’র ভিত্তিতে গাড়ি চালায় সেহেতু এরা একে অন্যকে ছাড়িয়ে আগে যাওয়ার জন্য এই ধরনের বেপরোয়া রেষারেষি করে থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭২ হাজার ৭৪৮ জন মারা গেছে এবং ৫২ হাজার ৬৮৪ জন আহত হয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়।  অপর এক হিসাবে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়।

শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মারা যাওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নির্দেশনা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এটা খুবই দুঃখজনক। এর আগে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেন। সেই কমিটি যেসব প্রস্তাবনা দিয়েছিল তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।  ১৯৯৫ সালে ‘সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠিত হয়। তখন কথা ছিল এই পরিষদ মাসে অন্তত একবার সভা করবে। পরে ঠিক করা হলো তিন মাস অন্তর সভা হবে। কিন্তু গত ২৩ বছরে এই কমিটি সভা করেছে মাত্র ২৪টি। আমরা আশা করেছিলাম যে এই কমিটির শেষ সভায় এক ধরনের সিদ্ধান্ত আসবে। কিন্তু ওই সভায় যেটা হলো, নতুন তিনটা কমিটি গঠন করে দেওয়া হলো। তার মধ্যে একটি কমিটির কাজ হলো নতুন আইন বা বিধিবিধান তৈরি করা। আরেকটি কমিটির কাজ হলো সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বা সড়কে শৃঙ্খলা আনতে প্রস্তাবনা তৈরি করা। সেই কমিটি এরইমধ্যে নাকি প্রস্তাবনা তৈরি করে ফেলেছে। কিন্তু মাননীয় সড়ক পরিবহন এবং সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুরে যাওয়ায় প্রস্তাবনাগুলো আটকে আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাসচাপায় নিহত হওয়ায় অনেকগুলো উদ্যোগ সামনে চলে এসেছিল। সেগুলো হলো, চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানো যাবে না, আনফিট গাড়ি চালানো যাবে না, গাড়ি চালানোর সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। তখন শিক্ষার্থীরা যেভাবে গাড়িচালকদের আইন মানতে বাধ্য করেছিল, যেভাবে সড়কে শৃঙ্খলা আনতে পেরেছিল তা অভূতপূর্ব।  এখন রাষ্ট্র কেন পারছে না? পুলিশ প্রশাসনের ট্রাফিক বিভাগ ট্রাফিক পক্ষ, ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করে থাকলেও ওই ধরনের শৃঙ্খলা তৈরি করতে পারছে না। প্রকৃত অর্থে, গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের দাবি ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যে ১৭ দফা নির্দেশনা ছিল সেগুলো সে সময় সাময়িকভাবে নিতে দেখা গেলেও এখন আর সেগুলোর বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

এখন বলা হয়ে থাকে, ৯০% মানুষ আইন মানে না। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ আইন মানছে না। তাহলে কি আইন প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে, নাকি আইনের মধ্যেই সমস্যা রয়েছে। আসল কথা হলো, আইন মানাতে হবে। যতক্ষণ আইন না মানা হবে ততক্ষণ যতই প্রস্তাবনা দেওয়া হোক না কেন তা কার্যকর হবে না। এক্ষেত্রে আইনে যে ‘৩০২ ধারা’ রয়েছে তাতে স্পষ্ট করা হয়েছে খুন করার উদ্দেশ্য থাকতে হবে।  কিন্তু চালকরা তো খুন করার উদ্দেশ্যে গাড়ি চালায় না। তাই এই ক্ষেত্রে আমাদের যে বিদ্যমান আইন আছে তারই প্রয়োগ ঘটাতে হবে। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে। আর পাশাপাশি চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মানসিকতা পরিবর্তনে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাদের আরও মানবিক হিসেবে গড়ে তুলুন। কর্র্তৃপক্ষ বলছে মানুষ আইন মানে না। এটা খুবই ভয়াবহ ব্যাপার।  মানুষ যদি আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় তাহলে তা খুবই উদ্বেগজনক। এই আইন না মানার সংস্কৃতি যদি অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তো রাষ্ট্র পরিচালনাই কঠিন হয়ে যাবে। রাষ্ট্র তো অকার্যকর হয়ে যাবে।

চালকদের মানসিকতা পরিবর্তন করার দায়িত্ব যাদের তারা কেন এত উদাসীন? কেন চালকরা পাল্টাপাল্টিভাবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর মানসিকতা পোষণ করে? কেন তারা চালকদের দক্ষতা ও সচেতনতার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন না? শহরে যান চলাচলের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন আইনের কঠোর প্রয়োগ ঘটাতে পারছে না, এক্ষেত্রে এসব ত্রুটি কেন এতদিনেও চিহ্নিত করা যায়নি?

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে স্কুলের পাঠ্যক্রমে সড়কে চলাচলের বিধি অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল।  চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এগুলো কোনোটাই বাস্তবায়িত করা হয়নি। আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি এরকম প্রজ্ঞাপন জারি করেন যে, যেখানে বড় ধরনের সমাবেশ হয় সেখানে সড়কে চলাচলের নিয়মকানুন সম্পর্কে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।  যেমন স্কুলে সড়ক বিধি ব্যবহারের জন্য শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ দেবেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ব্যবস্থা থাকবে। সরকারি অফিস, করপোরেট অফিসেও কর্মকর্তারা যদি একই দায়িত্ব নেন। মিল, ফ্যাক্টরি এবং গার্মেন্টসেও একই ব্যবস্থা থাকবে। এমনকি আমরা বলেছিলাম বিভিন্ন ফ্ল্যাটগুলোতে খরচ, উন্নয়ন নিয়ে সভা হয়। সড়কে চলাচলের নিয়মকানুন নিয়েও যদি একই ধরনের সভা হতো তাহলে ভালো হতো। আর এর জন্য ছয়মাস সময়সীমা নির্ধারণের কথাও আমরা বলেছিলাম। যদি প্রশিক্ষণের ছয়মাস পরে কেউ যদি সড়কে আইনভঙ্গের দায়ে ধরা পড়ে তাহলে তাকে তো জরিমানা করা হবে, এমনকি কর্র্তৃপক্ষকেও জরিমানা করা হবে। জনসচেতনতার অভাবেই প্রতিদিনই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। এসব কারণে যেমন চালককেও সচেতন হতে হবে তেমনি পথচারী ও যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। তাহলে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেকাংশে কমে যাবে।

বস্তুত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ থেকে অতি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও এর বাস্তবায়ন অতীব জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের উপায় খুঁজতে হলে সর্বাগ্রে দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সরকার তথা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, জনগণসহ সবাইকে মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনা অপ্রতিরোধ্য কোনো বিষয় নয়। এ জন্য দরকার সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন। এ অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো শনাক্ত বা চিহ্নিত করে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অতি দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। আর সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করাও আবশ্যক। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, সরকারসহ সর্বস্তরের জনগণের একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসা উচিত। এ পদক্ষেপগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ।

লেখক

 চলচ্চিত্র অভিনেতা ও ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান