মালিক সমিতির ঘোষণার পরও চুক্তিতে চলছে বাস

জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় গত বছরের ২৯ জুলাই দুই কলেজশিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর চুক্তিতে বাস চললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। কিন্তু সে ঘটনার সাড়ে সাত মাস পর গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরীকে (২০) যে বাসটি চাপা দেয়, সেটিও চুক্তিতে চলত বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেছেন, তাদের ঘোষণার পর যেসব মালিক চুক্তিতে গাড়ি চালিয়েছেন, তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। যারা এখনো চুক্তিতে চালাচ্ছেন, তাদের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হবে।

গত বছর রাজধানীর রেডিসন হোটেলের সামনে জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় নিহত হয়েছিলেন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মীম ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিম ওরফে রাজিব। ওই সময় টানা ৯ দিন রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলে। ওই ঘটনার বছর পার না হতেই গত মঙ্গলবার সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হন। এতে আবারও বিক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।

গত বছর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া চুক্তিতে বাস চললে রুট পারমিট বাতিলের ঘোষণা দেন। একই বছরের ৮ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেছিলেন, এখন থেকে পরিবহন কর্র্তৃপক্ষকে বেতনভুক্ত চালক নিয়োগ দিয়ে গাড়ি রাস্তায় নামাতে হবে। কোনো মালিক চালকের সঙ্গে চুক্তিতে গাড়ি চালালে তার নিবন্ধন বাতিল করা হবে। এ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকবে।

মালিক সমিতির হুঁশিয়ারির সাত মাস পার হয়ে গেলেও বাস্তবে সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। রাজধানীর অনেক রুটেই চুক্তিভিত্তিক ও সহকারী দিয়ে বাস চালানো হয় বলে জানিয়েছেন বাসশ্রমিকরা। বাসশ্রমিকরা জানান, রাজধানীতে যেসব বাস সিটিং হিসেবে চলছে, কেবল সেগুলোর চালক-শ্রমিকরা ট্রিপ হিসেবে বেতন পান। লোকাল বাসের মালিকরা নির্ধারিত চুক্তিতেই টাকা নিয়ে শ্রমিকদের দিয়ে গাড়ি চালান। মোহাম্মদপুর থেকে আজিমপুর পর্যন্ত চলা ১৩ নম্বর বাসের চালক মোক্তার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমগো গাড়ি কন্ট্রাক্টে (চুক্তিতে) চলে। ৪ হাজার ২০০ টাকা দৈনিক মালিককে দিতে হয়। বাকি রাস্তার সব খরচসহ পাঁচ হাজার টাকা পড়ে। তারপর যা থাকে আমার আর হেলপারের।’

বাসশ্রমিকরা আরও জানান, একই রুটের বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আর যাত্রীর জন্য ডাকাডাকির অন্যতম কারণ এই চুক্তি। পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার শর্তে বাস নিয়ে বের হন চালক ও শ্রমিকরা। আর ওই টাকা তোলার পর বাকি টাকা তাদের পকেটে যায়। শ্রমিকরাও চেষ্টা করেন, যত সম্ভব তত বেশি যাত্রী নেওয়া যায়। এ কারণে বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতায় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কর্মকর্তারা জানান, চুক্তিতে বাস চালানোর কারণে আজমেরী পরিবহন, সুপ্রভাত পরিবহন, স্কাই লাইন পরিবহন, ডিএমকে পরিবহন ও গাবতলী-সদরঘাট (সাত নম্বর রোড) পরিবহনের নিবন্ধন বাতিল করেছে সমিতি।

সুপ্রভাত বাসের ধাক্কায় নিহত আবরারের বাবার দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার পরিদর্শক তদন্ত আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘাতক বাসটির চালকের লাইসেন্স সঠিক ছিল। বাসটি তারা দৈনিক নির্দিষ্ট জমা হিসেবে চুক্তিতে চালাত। চালক সিরাজ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তার বাসের সুপারভাইজর ছিল ইয়াসিন। বাসের মালিকের নাম গোপাল। মালিকের পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক নাম-ঠিকানা এবং হেলপারের নাম ঠিকানা কৌশলে এড়িয়ে যান ওই চালক।’

ঘোষণার পরও চুক্তিতে বাস চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘যেসব কোম্পানি মালিকের কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে চুক্তিতে চালাচ্ছে, সমিতি তাদের নিবন্ধন বাতিল করেছে। এরপরও যেসব কোম্পানি এটা মানবে না, তাদের লাইসেন্স বাতিলের জন্য সুপারিশ করা ও সমিতির আওতায় হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’