উত্তর আমেরিকার ক্রেতা ব্র্যান্ডের জোট অ্যাকর্ডের বিদায় নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ও সহায়তা চেয়েছে সংস্থাটি। পোশাক কারখানার মালিকদের আপত্তির কারণে সরকার মেয়াদ বাড়ানোর বিপক্ষে থাকায় ছয়টি গ্লোবাল ব্র্যান্ড-প্রধানরা মন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে তাদের চাহিদা অনুযায়ী ১৮১ কার্যদিবস বা এক বছর সময় দিতে অনুরোধ করেছেন। তারা বলেছেন, অ্যাকর্ডকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে বিদায় করলে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশের ওপর ক্ষুব্ধ হবে, রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজ বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রচারে নামবে। তখন সোর্সিং পলিসি (কোন দেশ থেকে আমদানি করা হবে, তার নীতি) পর্যালোচনা করতে হবে আমাদের।
সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিকে এমন চিঠি দিয়েছেন বৈশ্বিক ব্র্যান্ড ইস্প্রিটের ল্যারি ব্রাউন, লবলাউর বব চান্ট, কোর্তে ইংলেসের বের্নাডো ক্রুজা, অট্টো গ্রুপের জোয়াসিম জে ওভারমায়ার, ইনডিটেক্সের সানতিয়াগো মার্টিনেজ ও এলসিডাব্লিউআইকিকির টেড সাউথাল।
২০১৩ সালে সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি সুবিধা স্থগিত করার পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার মান উন্নয়নে কাজ শুরু করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতা জোট অ্যালায়েন্স ও অ্যাকর্ড। কারখানা পরীক্ষা করে তারা যেসব সুপারিশ করেছে, তা বাস্তবায়নে মালিকদের অনেক অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ছোট অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কথা বলে বিজিএমইএ ও সরকার অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্সকে ছয় মাস সময় দিয়ে কয়েক দফা বাংলাদেশ থেকে চলে যেতে বললেও তারা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে। আদালতের রায়ের আগেই এক বছর মেয়াদেরর জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছে অ্যাকর্ড।
চিঠিটি পাওয়ার পর গত সপ্তাহে তৈরি পোশাক মালিকদের নিয়ে অ্যাকর্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মন্ত্রী। ওই বৈঠকে উপস্থিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিজিএমইএর তরফ থেকে বলা হয়েছে, বেশি মেয়াদে থাকতে হলে আটটি শর্ত মানতে হবে অ্যাকর্ডকে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, কোনো গ্রুপের একটি কারখানায় ত্রুটি থাকলে ওই গ্রুপের সমস্ত কারখানার পোশাক আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যাবে না। এ ছাড়া অ্যাকর্ডকে শুধুই কারখানার মান উন্নয়নে কাজ করতে হবে, শ্রমিক অধিকারের বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকতে হবে তাদের। বাণিজ্যমন্ত্রী দুই পক্ষকে বৈঠক করে সমঝোতায় পৌঁছার কথা বলেছেন। তার প্রেক্ষিতে আগামী ২৫ মার্চ বিজিএমইএর দেওয়া আটটি শর্ত নিয়ে দুই পক্ষ বৈঠক করবে।
টিপু মুনশিকে দেওয়া অ্যাকর্ডের ছয়টি ব্র্যান্ড প্রধানদের চিঠির একটি কপি দেশ রূপান্তর পেয়েছে। তাতে তারা লিখেছেন, অ্যাকর্ডের কার্যক্রম সহজভাবে হস্তান্তর করে বিদায় নেওয়া বিষয়ে সরকার গঠিত কমিটির সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুর্ভাগ্যজনক যে, এখনো এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। যদিও অ্যাকর্ড পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য বেশকিছু পয়েন্ট তুলে ধরেছে। সরকারের অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে যে তারা চায় অ্যাকর্ড খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে চলে যাক- আর তা ছয় মাসের বেশি নয়। যদিও রানা প্লাজা ধসের পর অ্যাকর্ডের কার্যক্রমের কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
‘অ্যাকর্ড ১৯০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা, যারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন এই ভেবে যে, আমাদের এই সফলতা শেষ মুহূর্তে দরজার কাছে এসে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে স্বচ্ছভাবে স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অক্ষমতা দেখাচ্ছে। আমরা জানি যে, এখানে কী ঘটছে তা আপনি বুঝতে পারছেন। এই ঐতিহাসিক ও অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী ক্রেতাদের কাছে এই বার্তাই দেবে যে, বাংলাদেশ এখনো অনিরাপদ পরিবেশে পোশাক তৈরি করছে’- টিপু মুনশিকে লিখেছেন ছয়টি ব্র্যান্ড-প্রধান।
‘এর ফলে বৈশ্বিক ক্রেতাগোষ্ঠী, সিভিল সোসাইটি ও পলিটিক্যাল সোসাইটি ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভয়াবহ প্রচারে নামবে, তখন মেইড ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের বদলে অন্য উৎস থেকে পোশাক আমদানির নীতি পর্যালোচনা করতে হবে আমাদের। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ও সরবরাহ লাইনে এই অস্থিরতার প্রয়োজন কী?’ যোগ করেছেন তারা।
অ্যাকর্ডের মেয়াদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিপু মুনশি জানান, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ একটি দেশ। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স পোশাক খাতে সংস্কারে নির্ধারিত মেয়াদের অতিরিক্ত সময় ধরে বাংলাদেশে কাজ করছে। তাদের অনুপস্থিতিতে এই সংস্কারের ধারাবাহিকতা যাতে চলতে থাকে সে জন্য এরই মধ্যে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ হিসেবে রেমিডিয়েশন কো-অর্ডিনেশন সেল (আরসিসি) গঠন ও তাকে কার্যক্ষম উপযোগী করে তুলতে এরই মধ্যে শক্তিশালী করা হয়েছে।
অ্যাকর্ড চিঠিতে লিখেছে, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) আওতাধীন আরসিসি এখনো পুরো সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে যে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অ্যাকর্ড অর্জন করেছে, তা ডিআইএফইকে দিয়ে আগামী এক বছরে তাদের দক্ষ করে তোলার পর বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে। এ জন্য ‘চাপিয়ে দেওয়া’ ছয় মাসের বদলে এক বছর সময় দেওয়ার কথা চিঠিতে বলেছে ব্র্যান্ডগুলো।