জোর চাই শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে

দেশে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষায় প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা পদ্ধতি না রাখার সিদ্ধান্তকে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। সাধারণ মানুষও মনে করছে কোমলমতি শিশুদের ওপর থেকে বছরজুড়ে শ্রেণিকক্ষের ক্লাস-পরীক্ষার চাপ কমানো গেলে তা শিশু এবং অভিভাবক সবার জন্যই ভালো হবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গেছে শহুরে অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে স্কুল থেকে পরীক্ষা বাদ দিয়ে দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। শিশুদের পাঠদানের পদ্ধতি অবশ্যই গভীর বিচার-বিশ্লেষণ ও গুরুতর আলোচনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না, প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। ২০১৪ সাল থেকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি চালু করা হয়। এখন তা এক বছর থাকলেও জাতীয় শিক্ষানীতি অনুসারে প্রাক-প্রাথমিক দুই বছর করার প্রক্রিয়া চলছে। তবে, এতদিন প্রাক-প্রাথমিকে কোনো পরীক্ষা না থাকলেও প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা নেওয়া হতো। এ ছাড়া সব শিক্ষার্থীকেই দিতে হয় ‘পঞ্চম শ্রেণি সমাপনী পরীক্ষা’। অবশ্য প্রাথমিক স্তর এখন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করায় পঞ্চম শ্রেণির এই ‘সমাপনী পরীক্ষা’ তুলে দেওয়ার জন্যও শিক্ষাবিদদের সুপারিশ রয়েছে।

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার লক্ষ্য শিশুদের ভাষা, যোগাযোগ, লেখা-আঁকা-সৃজনশীলতা ইত্যাদির বিকাশ ঘটিয়ে সামাজিকতার প্রাথমিক পাঠ দেওয়া। মূলত পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে বিষয়ভিত্তিক পাঠগ্রহণের উপযুক্ত করে গড়ে তোলাই এ স্তরের কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে এ পর্যায়েই শিশুদের অসহনীয় প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষার চাপে ফেলে দেওয়া হয়। যা শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দময় বিকাশকে রুদ্ধ করে। এ অবস্থায় তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা না রাখার চিন্তা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এতে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পরীক্ষা ছাড়া কীভাবে কার্যকর পাঠদান সম্ভব এবং তাতে বর্তমান শিক্ষকদের কীভাবে উৎসাহিত করা যাবে সে প্রশ্নের উত্তর আমাদের পেতে হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, দেশটিতে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত কাউকে পরীক্ষা দিতে হয় না, বাংলাদেশেরও উচিত প্রাথমিকের পরীক্ষা তুলে দিয়ে তাদের অনুসরণ করা।

ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থাকে এখন দুনিয়ার সেরা শিক্ষাপদ্ধতি বলে মনে করা হয়। সেখানে তিন বছর বয়সী শিশুদের ‘পাইভাকোতি’-তে দিতে হয়, বাংলায় যার অর্থ ‘দিবা যতœকেন্দ্র’। এই স্তরে খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানো আর আধো আধো ভাষা শিক্ষা শুরু হয়। তারপর পর্যায়ক্রমে শুরু হয় হাতে-কলমে শেখা, ব্যবহারিক ও কারিগরি শিক্ষা এবং বিষয়ভিত্তিক লেখাপড়ার পাঠ। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় যে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়, সেগুলো হচ্ছেÑ

প্রথমত : সারা দেশে একটি সমধর্মী শিক্ষা কাঠামো, যেখানে সব শিশুই লেখাপড়ার সমান সুযোগ পেয়ে বেড়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত : বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্বারোপ করে উচ্চমানের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং তৃতীয়ত : শিক্ষকদের জন্য ভালো বেতন ও সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সম্মান নিশ্চিত করা। এ ছাড়া ফিনল্যান্ডে ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাতও খুবই কম; প্রতি ২০ জন ছাত্রের জন্য একজন শিক্ষক। দেশটিতে শিক্ষার্থীদের একজন শিক্ষকের কাছে প্রায় টানা ছয় বছর শিক্ষা লাভ করতে হয়। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনায় রাখা হয়।

আমাদের শিক্ষা কাঠামোর একটা বড় দুর্বলতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যথাযথ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক না থাকা। কেননা, বেতন কাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধার বিবেচনায় যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা আরো উচ্চবেতনের চাকরিতে চলে যান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াতে আসেন না। তদুপরি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কারণে অনেক অযোগ্য প্রার্থীরাও এখানে নিয়োগ পান। এ অবস্থায় অবশ্যই শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য উপযুক্ত মানের শিক্ষক নিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সে জন্য শিক্ষক নির্বাচন পরীক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং সর্বোপরি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নইলে মেধাবী ও যোগ্যতাসম্পন্নদের শিক্ষকতা পেশায় আনা যাবে না এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত প্রাথমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষাদানও নিশ্চিত করা যাবে না।