নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়

জাসিন্ডার মতো নেতা চাই যুক্তরাষ্ট্রের

অস্ট্রেলিয়ার ২৮ বছর বয়সী বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গের হাতে নিউজিল্যান্ডে ৫০ মুসল্লি খুনের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটে সহিংস ঘৃণা কীভাবে অঙ্কুরিত ও মঞ্চস্থ  হয়, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলবে। আপাতত বিশ্বের উচিত নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন ভয়কে কীভাবে সামলেছেন, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

গত শুক্রবারের হত্যার পরপরই আরডার্ন তার ভোটারদের ক্ষোভের কথা শুনেছেন ও ঘোষণা দিয়েছেন, তার সরকার কয়েক দিনের মধ্যেই সামরিক ধাঁচের অস্ত্র (যেগুলো ব্যবহার করে ক্রাইস্টচার্চের বন্দুকধারী ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গণহত্যাকারী তাদের তাণ্ডব চালিয়েছে) নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থা নেবেন। তিনি তা-ই করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার আরডার্ন সব ধরনের সামরিক ধাঁচের আধা-স্বয়ংক্রিয় ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি রাইফেলকে স্বয়ংক্রিয় ও আধা-স্বয়ংক্রিয় বানাতে সক্ষম অস্ত্র ও বেশি গুলি ধারণে সক্ষম ম্যাগাজিনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা এনেছেন তিনি। ওই সময় তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের সবার বিষয়। এটি জাতীয় স্বার্থে করা হয়েছে এবং বিষয়টি নিরাপত্তার।’এর আগে একই সপ্তাহে তিনি পার্লামেন্টে বলেছিলেন, ঘৃণা ওগরানো ও সহিংসতার ছবি ছড়ানোর ক্ষেত্রে নমনীয়তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অবশ্যই মুখ খুলতে হবে। জাসিন্ডা বলেছিলেন, ‘আমরা নিষ্ক্রিয় বসে থেকে এটা মেনে নিতে পারি না যে, এই প্ল্যাটফরমগুলো থাকবে এবং এগুলোতে যা বলা হবে, তার জন্য প্রকাশের ক্ষেত্রগুলো দায়ী হবে না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘এটি শুধুই দায়িত্বহীন লাভের বিষয় হতে পারে না।’

মিসেস আরডার্ন ফেসবুক, টুইটার ও ইন্টারনেটের অন্য প্রকাশকদের ব্যবহারকারী কমাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার প্রস্তাব দেননি। তবে তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্রাইস্টচার্চ ও অন্য এলাকাগুলোতে যেসব

হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেজন্য বন্দুক প্রস্তুতকারী ও ডিলারদের মতো সামাজিক যোগাযোগের এসব প্ল্যাটফরমেরও দায় আছে।

আইনে পরিণত হওয়ার আগে বন্দুক নিয়ন্ত্রণের নতুন প্রস্তাবটি আরও নিখুঁত ও নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। নিউজিল্যান্ডের বিদ্যমান আইন অপেক্ষাকৃত নমনীয় এবং প্রায় আড়াই লাখ লোকের হাতে থাকা আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ লাখ আগ্নেয়াস্ত্রের বড় অংশ নিবন্ধিত নয়। নতুন আইনে এ অস্ত্রগুলোর কতসংখ্যক অবৈধ হবে, তা জানা যায়নি। তবে উন্মাদ একজন লোক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতকৃত একাধিক অস্ত্র দিয়ে কী করতে পারে, তার নমুনা দেখে দৃশ্যত নিউজিল্যান্ডবাসী ও পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ দ্রুত গুলি চালাতে সক্ষম অস্ত্রে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজন বোধ করে।

এই মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকটি গণহত্যায় ব্যবহৃত আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল এআর-১৫-এর মতো অস্ত্র ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগে ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন ও তাদের রাজনৈতিক সহযোগীদের বিরোধিতার পুরোপুরি বিপরীত।

নিউজিল্যান্ডে গুলি চালিয়ে গণহত্যার একটিমাত্র ঘটনা সরকারের টনক নড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু বন্দুকধারীর গুলিতে কানেকটিকাটের নিউ টাউনে স্কুলে ২৬ জন, অরল্যান্ডোর নাইটক্লাবে ৪৯, লাস ভেগাসের কনসার্টে ৫৮, ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডে স্কুলে ১৭ জন নিহত হওয়াও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট হয়নি। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৭৩ শতাংশ আমেরিকান মনে করে, বন্দুকসহিংতা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ দরকার।

সন্ত্রাসীদের পছন্দের অস্ত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল সংকটের মুহূর্তে আরডার্নের নেতৃত্ব দেখানোর একটি ক্ষেত্র। গতানুগতিক কথাবার্তার পরিবর্তে তিনি মাথায় কালো স্কার্ফ পরে একদল রাজনীতিককে নিয়ে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। একটি স্কুলে ভুক্তভোগী কয়েকজনের সামনে লিখিত বক্তব্য ছাড়াই বক্তৃতা দেন তিনি। ওই সময় তিনি বর্ণবাদ বরদাশত করা হয় নাÑ নিউজিল্যান্ডকে এমন দেশ বানাতে শিক্ষার্থীদের তাগিদ দেন। শোকাহত পরিবারগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো আপনার শোকের কথা জানব না, কিন্তু আমরা পদে পদে আপনাদের সঙ্গে চলতে পারব।’

লক্ষণীয় অঙ্গভঙ্গির প্রকাশ হিসেবে তিনি সন্দেহভাজন হত্যাকারীর নাম উচ্চারণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সে হয়তো নিষ্ঠুরতা চেয়েছিল, কিন্তু নিউজিল্যান্ডে আমরা কিছুই দেব না তাকে। এমনকি তার নামও নেব না।’

এটি (ক্রাইস্টচার্চে হামলা) ও এ ধরনের অন্য যেকোনো নৃশংসতার ক্ষেত্রে বর্ণবাদের সোজাসাপ্টা নিন্দায় বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া; ভুক্তভোগীদের ব্যথায় সমব্যথী ও ঘৃণাকারীদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া উচিত। আরডার্ন সে পথ দেখিয়েছেন।