নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নবনির্বাচিত সহ-সভাপতির (ভিপি) দায়িত্ব নিচ্ছেন নুরুল হক নুর। গতকাল শুক্রবার নিজেই সংবাদ সম্মেলন করে দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তার সঙ্গে একই প্যানেলের সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত আখতার হোসেনও দায়িত্ব নিচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে ডাকসুর নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক ঘিরে নানা নাটকের অবসান হলো।
একই সঙ্গে ডাকসুর হল সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের অভিষেকও হবে আজ। এ ব্যাপারে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট অসীম সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, হল সংসদের অভিষেকও একই দিন হবে। হলের অভিষেকে হল প্রভোস্টরা এবং প্রত্যেক হলের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়োগ দেওয়া একজন করে কোষাধ্যক্ষ থাকবেন। অন্যদিকে ডাকসুর কেন্দ্রীয় সংসদের অভিষেকে বিশ^বিদ্যালয় ভিসি-ডাকসু নির্বাচনের নির্বাচন কমিশন থাকবেন।
তবে প্রগতিশীল ছাত্র জোট প্যানেল থেকে নির্বাচিত দুই হল সংসদের সদস্য সুফিয়া কামাল হলের লামিয়া তানজিম তানহা ও কুয়েত মৈত্রী হলের ফারজানা আক্তার মিম অভিষেকে যাচ্ছেন না বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও বাম জোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী। তিনি বলেন, আমরা এ নির্বাচন মানি না।
গত ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনে ভোট চলাকালে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য সব প্যানেল। এ সময় নুর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দেন। উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাস। কিন্তু সেদিন মধ্যরাতেই ডাকসুর ফল ঘোষণায় ভিপি পদে নুর ও একই প্যানেলের আখতার হোসেন সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হলে ঘটনা বাঁক নিতে থাকে অন্যদিকে। সেই মধ্যরাতে ভিপি পদে নুরকে মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। তারা প্রকাশ্যে সিনেট ভবনে নুরবিরোধী নানা সেøাগান দিতে থাকেন।
ফল ঘোষণার পরদিন থেকে সন্দেহজনক হয়ে ওঠে নুরের গতিবিধি। তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাবেন, নাকি ভিপির দায়িত্ব নেবেনÑ এই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একেক সময় একেক কথা বলতে থাকেন নুর। ১২ মার্চ পুনরায় ডাকসুর দাবিতে অনশন করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে গিয়ে নুর বলেন, তিনি ভিপি পদ ও তার প্যানেল থেকে বিজয়ী আখতার হোসেনের সমাজসেবা সম্পাদক পদ বাদে ডাকসুর বাকি ২৩ পদে নির্বাচন চান। পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে নুর আন্দোলন করবেন বলে ঘোষণা দেন।
এরপর গত ১৬ মার্চ নুরসহ ডাকসু ও হল সংসদের নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে যান। পরের দিন ১৭ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর সব পদে পুনরায় নির্বাচন চান বলে ঘোষণা দেন। নুরের এমন দ্বৈতমতের কারণে ডাকসুতে তিনি দায়িত্ব নেবেন কি না সেটা নিয়ে সংশয় বাড়তে থাকে। শেষপর্যন্ত গতকাল ভিপি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সেই জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটান নুর নিজেই।
ডাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ প্যানেল থেকে ভিপিসহ দুটি পদ ছাড়া বাকি ২৩টি পদেই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের প্যানেল জয় পায়। জিএস নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসেন। তবে হল সংসদে ১৮টি হলের মধ্যে ১২টিতে ছাত্রলীগের প্রার্থীরা সহসভাপতি (ভিপি) পদে ও বাকি ছয়টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। আর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ১৪টিতে ছাত্রলীগ ও বাকি চারটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছেন। ছাত্রদল ও বাম সংগঠনের কেউ জেতেননি।
সংবাদ সম্মেলনে নুর যা বলেন : গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে নুরুল হক নুর বলেন, শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে ডাকসুর কার্যকরী সভায় আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করব। পুনর্র্নির্বাচনের দাবিসহ শিক্ষার্থীদের অন্য যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধান করতে আমাদের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রাম চলবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব অঙ্গসংগঠন বা কথা বলার জায়গা রয়েছে, সেসব জায়গায় অনিয়ম নিয়ে কথা বলতেই আমরা দায়িত্ব নিচ্ছি।’
দায়িত্ব নিয়ে পুনর্র্নির্বাচনের দাবি স্ববিরোধী কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে নুর বলেন, ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণা দেওয়া মানেই হলো এই নির্বাচন মেনে নেওয়া হয়েছে। সেই জায়গা থেকে আরেকটা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই কমিটি থাকবে। সেক্ষেত্রে আরেকটা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তো শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে। যেহেতু ২৮ বছর পর নির্বাচন হয়েছে, আমরা চাই না যে এই প্রক্রিয়াটা থেমে থাকুক। আমরা চাই, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকুক।
নুরুল হক নুর বলেন, দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে মেধাভিত্তিক সুস্থধারার ছাত্র রাজনীতির পরিবর্তে অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর অপরাজনীতির বিকাশ ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি ছাত্রী হল আর বিজয় একাত্তর হল ছাড়া অন্য হলগুলো প্রশাসন যেন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের কাছে ইজারা দিয়েছে। যে মেধা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে, সেই মেধা ও অর্থনৈতিক অবস্থা দেখেই হলে তাদের আসন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীকে জোর করে মিছিল-মিটিং করানো যাবে না এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে হলে সিট দেওয়া যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন বলেন, ‘ডাকসুতে নির্বাচিত নুরুল হক ও আখতার হোসেনের দায়িত্ব গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের সংগঠন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষার্থীর ম্যান্ডেটকে প্রাধান্য দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে নুরের প্যানেল থেকে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা রাশেদ খান ও এজিএস পদে ফারুক হোসেন ‘কলঙ্কিত নির্বাচন বাতিল করে পুনর্র্নির্বাচনের দাবিতে যে আন্দোলন চলছে, তাকে ত্বরান্বিত করার জন্য নুরুলের দায়িত্ব নেওয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেন।
প্রস্তুত বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ : আজ বেলা ১১টায় ডাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে এই অভিষেক সভা। গত ১৮ মার্চ সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কমিটির সভায় অভিষেকের সিদ্ধান্ত হয়। অভিষেক উপলক্ষে ডাকসু ভবন ও হলগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক অসীম সরকার।
অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন : এর আগে গত বৃহস্পতিবার ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে গণিত বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক সাজেদা বানুকে আহ্বায়ক করে গঠিত ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সর্বশেষ ১৯৯২ সালে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবার ভিপি ও জিএস পদে নির্বাচিত হন ছাত্রদলের যথাক্রমে আমান উল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন।