নির্দেশনা মানছেন না পুরান ঢাকার প্লাস্টিক ব্যবসায়ীরা

অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ‘ফায়ার ডিস্টিংগুইশার’ এবং পানি ও বালি রাখতে বলা হলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী মেয়রের দেওয়া এ নির্দেশনা মানছেন না। কেউ কেউ ফায়ার ডিস্টিংগুইশার রাখলেও বালি বা পানি রাখেননি কেউই। পাশাপাশি দোকানে শুধু স্যাম্পল রাখার কথা থাকলেও করা হচ্ছে মজুদ। গত বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার চকবাজারের কয়েকটি এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

গত ১০ মার্চ প্লাস্টিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার শর্তে প্লাস্টিক দানা ও অর্গানিক পিগমেন্ট বিক্রির অনুমোদন দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে ফায়ার ডিস্টিংগুইশার, এক বালতি পানি ও বালি রাখার জন্য সাত দিনের আল্টিমেটাম

দেন মেয়র। তখন ব্যবসায়ীরা তাকে কথাও দেন। কিন্তু ১১ দিন পার হলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ীই অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা রাখেননি।

চকবাজারের উর্দু রোড সংলগ্ন হরনাথ ঘোষ রোড, মাওলানা মুফতি দীন মোহাম্মদ রোড, কে বি রুদ্র রোড ও হায়দার বক্স লেন ঘুরে কিছু প্লাস্টিকের দোকানে ফায়ার ডিস্টিংগুইশার পাওয়া গেলেও বালি বা পানি দেখা যায়নি কোথাও।

হায়দার বক্স লেনের লাকি প্লাস্টিক স্টোরে ছিল বস্তা ভরা প্লাস্টিকের মজুদ। ছিল না অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা। জিজ্ঞেস করলে দোকানের মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যবস্থা করতেছি ভাই। সময় তো দিতে হবে। ওরা তো সাপ্লাই দিয়ে কুল পাচ্ছে না। একসঙ্গে এত ফায়ার ডিস্টিংগুইশার দিতে কোম্পানি হিমশিম খাচ্ছে। তারা বলেছে পরে যেতে।’ কথা বলার একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, ‘যেগুলো দরকার সেগুলো ধরে না। আমাদের এগুলো কি কমিক্যাল? আগুন তো ধরছে সিলিন্ডার থেকে, অথচ বলা হচ্ছে কেমিক্যাল, কেমিক্যাল।’ লেনের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘গোডাউনে চারটি ডিস্টিংগুইশার লাগাইছি। দোকানে এখনো লাগাইনি।’ তার দোকানেও প্লাস্টিকের মজুদ দেখা গেছে।

মেয়রের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সভা হয়েছিল হরনাথ ঘোষ রোডে। সেই রোডেই ব্যবসায়ী হাজী হেলাল উদ্দিনের প্লাস্টিকের দোকান। তিনি বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ। ব্যবসায়ীদের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তদারকির দায়িত্ব তাদের। অথচ তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই নেই কোনো ব্যবস্থা। তার দোকানের এক কর্মচারী বলেন, ‘ওটা (ফায়ার ডিস্টিংগুইশার) লাগানোর জন্য দেয়ালে জায়গা ঠিক করছি। এতদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম। লাগিয়ে ফেলব। আমার বস সমিতির লোক সমস্যা নাই।’

কে বি রুদ্র রোডের একজন ব্যবসায়ী ফায়ার ডিস্টিংগুইশার রাখলেও বালি বা পানি রাখেননি। তবে তিনি খাবারের জন্য রাখা ফিল্টারের পানির বোতলকেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা হিসেবে দেখালেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ প্লাস্টিক মালিক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘গোডাউনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার প্রতি জোর দিচ্ছি আমরা। দোকানগুলোতেও রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের অগ্নিনির্বাপণ ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। ১০ জন করে পাঠিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হবে।’

চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গোডাউনের তুলনায় দোকানগুলোই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এজন্য সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেন মেয়র। অন্যদিকে দোকানগুলোতে শুধু স্যাম্পল রাখার কথা থাকলেও ব্যাপক মজুদ রেখে দোকানগুলোকেই গোডাউনে পরিণত করেছে অনেক ব্যবসায়ী। এ ব্যাপারে সমিতির সভাপতি বলেন, ‘দোকানে স্যাম্পলের জন্য সর্বোচ্চ দু-চার বস্তা প্লাস্টিক রাখার কথা। শনিবার (আজ) থেকে আমরা নামব। প্রত্যেক দোকানে চেক করব। দেখব কোন দোকানে মাল আছে। সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার ডিস্টিংগুইশার লাগানোর জন্য বলব। না হলে বলব মাল সরাতে।’ এ বিষয়ে জানতে সাঈদ খোকনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৭০ জন প্রাণ হারান। এরপর পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যাল অপসারণে গঠিত টাস্কফোর্স অভিযান শুরু করে। অভিযান প্লাস্টিক ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়লে মেয়র তাদের সঙ্গে বসেন। পরে বিস্ফোরক অধিদপ্তর প্লাস্টিক দানাকে অবিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ ঘোষণা করলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার শর্তে প্লাস্টিক দানাকে অভিযানের আওতামুক্ত করেন মেয়র।