ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সদস্য বিএলআই সিকিউরিটিজ ও প্লাটিনাম সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। ১৯৮৮ থেকে পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত মিনহাজ মান্নান ইমন বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার আলতাফ মাসুদের সঙ্গে
চলতি বছরের শুরুতে পুঁজিবাজারে সাময়িক ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। তবে এর পর থেকেই বাজার পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতি ঘটতে দেখা যাচ্ছে। এর কারণ কী?
২০১৯ সালের শুরুতে পূরনো সরকারের ধারাবাহিকতা ও নতুন অর্থমন্ত্রী আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, জানুয়ারিতে যার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। তবে দুঃখজনক হচ্ছে, এ ধারাবাহিকতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ফেব্রুয়ারি থেকেই পরিস্থিতির অবনতি আমরা দেখছি। এর কারণ হচ্ছে, যারা বাজারের মন্দা চলাকালীন কম দরে শেয়ার কিনেছিলেন, জানুয়ারির ঊর্ধ্বগতির সময়ে তাদের বড় অংশই তা বিক্রি করে মুনাফা তুলে নিয়েছেন। এ সময় রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবিও বড় অংকের শেয়ার অফলোড করেছে। এর বাইরে সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনতে না পারাও বাজার পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে লেনদেন কমে যাওয়ার কারণ কী?
সংগত কারণেই বাজার নিয়ে আশা-ভরসা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে, লেনদেনও বাড়ে। কিন্তু যখন এখান থেকে মুনাফা করা অনেক কঠিন
হয়ে পড়ে, পরিস্থিতির অবনতি হয়, তখন বিনিয়োগকারীরাও বেরিয়ে যায় কিংবা সাইড লাইনে থাকে। পরিস্থিতির কারণে সূচক কমে যেতে পারে, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে যদি লেনদেনও কমে যায়, সেটি কিন্তু শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় স্পষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এছাড়া সুদহার বৃদ্ধির কারণেও অনেকেই বিনিয়োগ প্রতাহার করে স্থায়ী আমানত হিসেবে রাখছেন, যাতে পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ কমে যাচ্ছে।
বর্তমানে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ তলানিতে নেমে এসেছে। এটা বাড়ানো যায় কীভাবে?
এটা গত বছর থেকেই আমরা কমতে দেখছি। বিনিয়োগকারীরা কিন্তু লাভের জন্য পুঁজিবাজারে আসেন। কিন্তু তারা যখন ঋণ দিয়ে বেশি লাভ করতে পারছেন, তখন কেন ঝুঁকি নিয়ে বাজারে আসবেন। এখন তো বাজার থেকে লাভ করা যাচ্ছে না। এছাড়া বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই এক্সপোজার লিমিটের মধ্যে পড়ে গেছে। ফলে নতুন করে যে তারা বিনিয়োগ করবে, সে সুযোগও তাদের নেই। যাদের সক্ষমতা রয়েছে, পরিস্থিতির কারণে তারাও এখন বিনিয়োগে আগ্রহী নন।
ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?
এটি খুবই দূঃখজনক যে, আমরা দীর্ঘদিন ভালো আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) পাচ্ছি না। ভালো শেয়ার আনতে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট করহারের ব্যবধান আরও বাড়ানো উচিত। এছাড়া এসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত করতেও স্টক এক্সচেঞ্জও ব্যর্থ হয়েছে। ১০ শতাংশ কর সুবিধার চাইতে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, রিপোর্টিং ইত্যাদি অনেক কারণকে যন্ত্রণা বলে মনে করে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো।
বাজার পরিস্থিতি উন্নয়নে করণীয় কী?
আমাদের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, এখানে প্রডাক্টের অভাব। বিনিয়োগকারীর পুঁজিকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আমাদের এখানে কিন্তু বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। আমরা অফিশিয়ালি ইক্যুইটি মার্কেটের বাইরে পুঁজি খাটানোর জন্য অন্য কোনো প্লাটফর্ম দিতে পারছি না। তাই ইক্যুইটি মার্কেটের উত্থান-পতনের ওপর তখন বিনিয়োগকারীর আসা-যাওয়া নির্ভর করে। আমরা যদি আজ ফিউচার, ডেরিভেটিভস, গোল্ড কিংবা বন্ড মার্কেট তৈরি করতে পারতাম, তাহলে একজন বিনিয়োগকারী কিন্তু তহবিল বহুমুখীকরণ করতে পারতেন। এ বিষয়ে আমাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া বহুজাতিক ও স্থানীয় বড় কোম্পানিগুলোকে কীভাবে বাজারে আনা যায়, কোনো আইনি সংস্কারের প্রয়োজন আছে কি না, ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।