জনসংখ্যা ২০ গুণ বেশি হলেও দেশের সবচেয়ে ছোট মেহেরপুর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সুবিধায় খুব একটা ফারাক নেই ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের। এই পরিমাণ জনবল দিয়ে ঢাকাবাসী দেড় কোটি লোককে নির্ধারিত ৮৬ ধরনের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। ঢাকাবাসীর সেবার দিক বিবেচনা করে পুলিশের জনবল ও অবকাঠামো যথেষ্ট বাড়লেও জেলা প্রশাসনের জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়েনি। এ অবস্থায় নগরবাসীকে দ্রুততম সময়ে সেবা নিশ্চিতে জেলা প্রশাসনের আওতায় ঢাকা শহরের চারদিকে চারটি সমন্বিত ভূমি প্রশাসন কার্যালয় এবং ১৫ থেকে ২০ তলা একটি ওয়ান স্টপ কমপ্লেক্স ও প্রশাসনিক ভবন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের তথ্য তুলে ঢাকা জেলা প্রশাসনের কলেবর বাড়ানোর এসব প্রস্তাব গত ১৯ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব শাফায়াত মাহবুব চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ঢাকা জেলার জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এই জনসংখ্যা দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা মেহেরপুরের ২০ গুণ, গাজীপুর জেলার পাঁচ গুণ, চট্টগ্রামের দ্বিগুণ এবং কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলার জনসংখ্যার তিন গুণ। ঢাকার জনসংখ্যা অন্য অনেক জেলার তুলনায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি। অথচ মেহেরপুর জেলাসহ গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ অন্য জেলাগুলোর জনগণকে সরকারি সেবা দেওয়ার জন্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে, ঢাকা জেলায় তার চেয়ে কিছুটা বেশি সুযোগ-সুবিধা থাকলেও জনসংখ্যা অনুপাতে তা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, দেড় কোটি জনসংখ্যাকে নির্ধারিত ও অনির্ধারিত সেবা দিতে গিয়ে জেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ এই সেবার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশের জনবল ও অবকাঠামো যথেষ্ট পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। তাই বিপুল জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করতে ভূমি রাজস্বসহ অন্যান্য সরকারি সেবাসংশ্লিষ্ট জনবল ও অবকাঠামো বাড়ানো আবশ্যক।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবর্তন এনে ঢাকা শহরের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম পয়েন্টে উপসচিব বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার চারটি পদসহ অন্যান্য জনবল নিয়ে চারটি সমন্বিত ভূমি প্রশাসন স্থাপনের কথা বলেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এসব সমন্বিত ভূমি প্রশাসন কার্যালয়ে ভূমি সার্কেল, তহশিল, রেজিস্ট্রেশন ও জরিপ বিষয়ে সেবা দেওয়া হবে। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগ ও দপ্তরের পর্যাপ্ত কর্মচারী নিয়ে নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করতে ১৫ থেকে ২০ তলা বিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক ও ওয়ান স্টপ কমপ্লেক্স স্থাপনের কথাও বলেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কলেবর বাড়াতে আরও কী কী করণীয় সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসককে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়, কাজের পরিধি বিবেচনায় দেশের যেকোনো জেলার চেয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পরিধি ব্যাপক। তাই নাগরিক সুবিধা দিতে ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে অন্য যেকোনো জেলা থেকে বেশি জনবল ও অবকাঠামো প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠি পেয়েছি। কাজও শুরু করেছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই কাজের চাহিদা বাড়ছে। জেলা প্রশাসনের আওতাধীন সেবার পরিধিও বাড়ছে। বিদ্যমান জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে সময়মতো সেবা নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। তাই সময়মতো নগরবাসীর জন্য নির্ধারিত সেবা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জনবল ও অফিসÑ দুটোই দরকার।’
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সিটিজেন হেল্প ডেস্ক অ্যাপে ঢাকা জেলা প্রশাসনের ৮৬ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়ার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বিতরণ ও সনদ যাচাই, সার ডিলার নিয়োগ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সনদ দেওয়া, প্রবাসীদের বৈবাহিক তথ্য ও অভিযোগ নিষ্পত্তি, এম ক্যাটাগরির ভিসা তদন্ত, আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থের লাইসেন্স দেওয়া, সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনাদায়ী রাজস্ব আদায়, অধিগ্রহণ করা জমির অ্যাওয়ার্ড তৈরি ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আবাসিক হোটেল ও রেস্তোরাঁর নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেওয়া, এসিড ব্যবহার ও বিক্রির লাইসেন্স, জুয়েলারি ডিলারের লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স দেওয়া ও নবায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনসহ পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা করা, দলিল অবমূল্যায়ন ও সার্টিফিকেট মামলার কাজ, স্থানীয় সরকার ও বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সংক্রান্ত কাজ, অর্পিত ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি দেখভাল এবং আইনশৃঙ্খলা ও প্রটোকল-সংক্রান্ত কাজ। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে মোট জনবল ১৩৭।
ঢাকায় মানুষের চাপ কমাতে বিভাগীয় শহরগুলোতে ঢাকার মতোই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য মানসম্মত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে কর্মসংস্থানের জন্য সারা দেশ থেকে মানুষের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা শহরের যানজট কমাতে অন্তত সারা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ঢাকা শহরের মতোই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।