আবার নাটক শুরু হয়েছে জাতীয় পার্টিতে। মাস দেড়েক চুপ থাকার পর পুনরায় অস্থিরতা শুরু করেছেন দলের চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। কিছুদিন আগেও যে আদরের ভাইকে বুকে টেনে নিয়ে তার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা দিয়েছিলেন, কো-চেয়ারম্যান করেছিলেন, এমনকি বানিয়েছিলেন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা; এবার সেই ভাইকে মাত্র ১৮ ঘণ্টার ব্যবধানে সবগুলো পদ থেকে সরিয়ে দিলেন এরশাদ।
এই সরিয়ে দেওয়ার পেছনে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে দল পরিচালনায় ‘ব্যর্থতা’ ও দলের মধ্যে ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দলের’ অভিযোগ আনেন। জি এম কাদেরের পরিবর্তে সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে স্ত্রী ও দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের নাম ঘোষণা করেছেন এরশাদ।
হঠাৎ করেই এরশাদের এমন সিদ্ধান্তে বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা। ভয়ে কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেসিডিয়াম সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারও সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই শুক্রবার রাতে হঠাৎ করেই জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেন এরশাদ। ভেবেছিলাম, পরদিন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করব। কিন্তু তার আগেই শনিবার বিকেলে সংসদের উপনেতা থেকে বাদ দেন জি এম কাদেরকে। হঠাৎ করেই এমন সিদ্ধান্তে আমরা হতবাক।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এরশাদের ঘনিষ্ঠ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, দলে আরও পরিবর্তন আসছে। শোনা যাচ্ছে, দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাকেও তার পদ থেকে সরানো হতে পারে। পরিবর্তন আসতে পারে প্রেসিডিয়াম সদস্য পদেও।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য জি এম কাদেরকে পাওয়া যায়নি। তবে শুক্রবার রাতে একটি অনলাইনকে তিনি কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার এরশাদের সিদ্ধান্তকে ‘রহস্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এমনকি এরশাদের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার ‘সন্দেহ’ হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান স্যার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তিনি যেকোনো বিষয়ে একক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পরে সেটি সাধারণ সভায় পাস করিয়ে নেন। সুতরাং স্যারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো কথা নেই। তার পরও আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। স্যার বলেছে, এটা আমাদের দুই ভাইয়ের ব্যাপার। এর বেশি কিছু আমি জানি না।’
গত শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া এরশাদের এসব সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ কীÑ জানতে চাইলে সঠিক করে কিছুই বলতে পারছেন না কেউ। এক প্রেসিডিয়াম সদস্য জানান, সবকিছুই ভুতুড়ে মনে হচ্ছে তাদের কাছে। বিশেষ করে এরশাদ জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। এমনকি এবার এসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারে এরশাদ কেন দলের অন্যান্য নেতাদের উপেক্ষা করছেন, তাও স্পষ্ট নয়। হঠাৎ করে রওশন এরশাদের প্রতি এরশাদেও এমন প্রীতির নেপথ্য কারণ কী, তা নিয়েও সন্দিহান সবাই। তবে তারা একটা বুঝতে পারছেন যে, সবকিছুই রওশন এরশাদের সিদ্ধান্তেই হচ্ছে।
অবশ্য জাতীয় পার্টিতে হঠাৎ করে এমন রদবদলের পেছনে দলের ভেতর ও বাইরে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারক নেতারা। তারা জানান, জি এম কাদের দলে শক্ত অবস্থানে থাকলে কোনো পক্ষই দল থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারে না। বরং তাদের জন্য রওশন এরশাদই ভালো। এই রওশনপন্থিরাই দীর্ঘদিন ধরে জি এম কাদেরকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য দলের ভেতর ও বাইরে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। সর্বশেষ গত বুধবার এরশাদের ৯০তম জন্মদিনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দিয়ে হইচই করায়। সেদিনই এরশাদ জি এম কাদের ও মশিউর রহমান রাঙ্গার ওপর ভীষণ ক্ষুব্ধ হন।
তা হলে কারা আসছেন পরিবর্তিত পদগুলোতেÑ জানতে চাইলে দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ধারণা দেন, সম্ভবত রওশন এরশাদপন্থি লোকজন শীর্ষ পদগুলোতে বসবেন। এর মধ্যে জি এম কাদেরের জায়গায় জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সেনাকর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে দেখা যেতে পারে। আর মহাসচিব পদে এরশাদ-রওশনের ছেলে সা’দ এরশাদের নাম শোনা যাচ্ছে।
গত শুক্রবার রাতে প্রথমে দলের কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে, পরে গতকাল শনিবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির উপনেতার দায়িত্ব থেকেও ভাই জি এম কাদেরকে সরিয়ে দিয়েছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দলের জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান স্ত্রী রওশন এরশাদকে এই দায়িত্বে এনেছেন তিনি। এর আগে দশম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ছিলেন রওশন। রওশনকে সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা মনোনীত করে শনিবার বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন এরশাদ।
জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে কিছুটা স্থির ছিলেন এরশাদ। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ২০ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান। গত ৪ ফেব্রুয়ারি এরশাদ দেশে ফিরলেও কোনো প্রকাশ্য সভায় আসেননি। বুধবার তার ৮৯তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে গান গেয়ে শোনান রওশন এরশাদ। ওই অনুষ্ঠানে এরশাদের পাশে জি এম কাদেরকেও দেখা যায়। ঠিক এর দুই দিনের মাথায় গত শুক্রবার রাতে জি এম কাদেরকে নিয়ে এরশাদের এই সিদ্ধান্ত এলো।