চট্টগ্রামে শর্তপূরণে ব্যর্থ দেড় শতাধিক গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি বন্ধ

বিদেশি ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের আরোপিত শর্ত পূরণ করতে না পেরে গত চার বছরে চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে দেড় শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা, যেগুলোর অধিকাংশই যথাসময়ে অন্যত্র কারখানা স্থানান্তর করতে পারেনি। বন্ধ কারখানার মালিকদের কেউ কেউ মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন করে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশই অর্থাভাবে নতুন করে কারখানা স্থাপন করতে পারছে না।

তৈরি পোশাক শিল্পমালিক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিএমইএর ৬৮৬ সদস্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এখন চালু আছে মাত্র ৩৫১টি। এর মধ্যে সরাসরি পোশাক রপ্তানির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০০টি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে কয়েকটি কারখানার ১২৪ জন পোশাককর্মী নিহত হওয়ার ঘটনার পর কারখানার কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে কাজ শুরু করে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। এর পর থেকে চার বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ১৫৩টি প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রামে সর্বশেষ গত সপ্তাহে বন্ধ হয়ে যায় এঞ্জেলা ফ্যাশন লিমিটেড। নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন আসকারাবাদ এলাকার এ পোশাক কারখানাটিতে শ্রমিক ছিল ২২৫ জন। এই কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ এম জিয়াউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে ভবনে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল, সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই কারখানাটি বন্ধ করা হয়েছে। সংস্কার শেষে পুনরায় কারখানা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কয়েক বছর আগে বন্ধ হওয়া একই ভবনে অবস্থিত পোশাক কারখানা সাদাফ ফ্যাশন লিমিটেডের এমডি এস এম জাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জার্মানি, ইতালি ও সুইডেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল আমাদের কারখানায় উৎপাদিত পোশাকের ক্রেতা। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের পরিদর্শক দল কারখানা ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যায়িত করে সেখান থেকে সরানোর শর্ত দিলে উপযুক্ত জায়গা না পাওয়া এবং আর্থিক সক্ষমতা না থাকার কারণে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। তিনি বলেন, ‘বন্ধ হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৭ বার ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার একটি ভূমিকম্পও ছিল। কিন্তু ভবনটির কিছু হয়নি। অথচ তারা বলেছে, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘একসময় আমি কোটি কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছি, আজ আমি কপর্দকশূন্য। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানা অন্যত্র স্থানান্তরে যে আর্থিক সক্ষমতা দরকারÑ তা আমাদের নেই। মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক জোনে বন্ধ কারখানা স্থাপনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে প্রত্যেক প্লটের জন্য এক বছরের মধ্যে এক কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধ্যকতা দেওয়া হয়েছে, যেটা সবার সামর্থ্যে নেই।’

তৈরি পোশাক খাতে জড়িত ব্যবসায়ীরা জানান, নগরীর কালুরঘাটে গড়ে ওঠা ‘দেশ গার্মেন্টস’ দিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরের দুই দশক ভালো অবস্থানেই ছিল চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্প। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে চট্টগ্রামে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে এ খাতটি।

বিজিএমইএর পরিচালক ও ও এম এস ওয়্যারিং অ্যাাপারেলস লিমিটেডের এমডি আ ন ম সাইফুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনার পর ২০১৩ সাল থেকে এদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিদেশি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ও এনএপি (ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান) নীতিমালার আলোকে কমপ্লায়েন্সের শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

তিনি বলেন, ‘ভবন নিরাপত্তা ও অগ্নি নিরাপত্তার শর্তপূরণ করতে অক্ষম হওয়ায় সারা দেশেই একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টস কারখানা। এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের দেড় শতাধিকসহ সারা দেশে প্রায় ৯০০ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।’ গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও এ খাতের শ্রমিকরা বেকার বসে নেই মন্তব্য করে সাইফুদ্দিন বলেন, ‘এমনিতে আমাদের শ্রমিকের সংকট ছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের বেশিরভাগ অন্য কারখানায় কাজ নিয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে বেশ কিছু গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এসব কারখানায় অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।’