সাংবাদিকদের দুদক সচিব আবজালের সম্পদ তদারকিতে রিসিভার নিয়োগ হবে

দুর্নীতির অভিযোগে কুখ্যাতি পাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের ছয়টি বাড়ি ক্রোক করে সেগুলো তদারকির জন্য আদালতের মাধ্যমে রিসিভার (তদারককারী) নিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখ্ত। গতকাল রবিবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি আরও জানান, আবজালের অন্যান্য বাড়ি এবং স্থাবর সম্পদও ক্রোক আদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এটা সময়সাপেক্ষ বিষয়। চাইলেই করা যায় না। কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। বলেন, আবজাল-রুবিনার দুর্নীতির অনুসন্ধান প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ বিষয়ে কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে মামলা করা হবে। এদিকে গতকালই  আবজালের সম্পদ তদারকিতে রিসিভার নিয়োগ হবে

আবজাল-রুবিনা সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. আবদুর রশীদ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সাবেক দুই অধ্যক্ষসহ ১৪ জনকে তলব করা হয়েছে। তাদের ১ থেকে ৩ এপ্রিল দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে।

সচিব সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা খবর পাচ্ছিÑ আবজাল ও তার স্ত্রী রুবিনা খানম বিদেশে আত্মগোপন করেছেন। আমরা এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি। গত ৬ জানুয়ারি অভিবাসন পুলিশকে তাদের পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এরপর কোনো বন্দর ব্যবহার করে তাদের বিদেশ যাওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও যদি তারা বিদেশে আত্মগোপন করে থাকেÑ তা জানতে চেয়ে তদন্ত কর্মকর্তা গত ১৩ মার্চ অভিবাসন কর্র্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দিয়েছে। তাদের জবাব এখনো আসেনি। আর যদি আবজাল দম্পতি দেশে থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। আবজাল দেশের বাইরে গিয়ে থাকলে সে ক্ষেত্রে কারও অবহেলা বা দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দুদক আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আবজাল দম্পতির বিদেশ পালানোর নেপথ্যে দুদকের একাধিক কর্মকর্তার হাত থাকতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, এরকম কোনো তথ্য আমার জানা নেই। হয়ে থাকলে অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা অবশ্যই খোঁজ-খবর নেবেন। তিনি আরও বলেন, আবজালের উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের দুটি বাড়ি ও রুবিনার উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের তিনটি বাড়ি এবং একটি নির্মিতব্য ফ্ল্যাট ক্রোক করা হয়েছে। এখন সেগুলো তদারকিতে আমরা নিয়ম অনুসারে রিসিভার নিয়োগের জন্য আদালতে আবেদন করেছি। আদালতের আদেশ অনুসারে ওইসব সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।

দুদক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও আবজাল ও তার স্ত্রীর কিছু ব্যাংক হিসাবে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছেÑ এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদক সচিব বলেন, এ বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবজাল ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার না করার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুদক একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে। আবজালের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর তিনি দুদককে অসহযোগিতা করেননি। তিনি কী পরিমাণ দুর্নীতি করেছেন সেটা জানার চেষ্টা চলছে। তার বিরুদ্ধে মামলারও প্রক্রিয়া চলছে। এই অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তারের সুযোগ ছিল না। তার পাসপোর্ট ব্লক রাখা ছিল। কিন্তু তারপরও তিনি কীভাবে আত্মগোপন করেছেন সেটা খতিয়ে দেখা হবে।

প্রসঙ্গত, আবজাল-রুবিনা দম্পতির জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে চলতি বছর ৬ জানুয়ারি অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে দেশ ও দেশের বাইরে তাদের ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় সম্প্রতি দুদকের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করেছে এই দম্পতি। দুদক তাদের অবস্থান জানার চেষ্টা করছে। দুই অধ্যক্ষসহ ১৪ কর্মকর্তাকে দুদকে তলব : আবজালের স্ত্রীর কোম্পানির নামে সিন্ডিকেট করে কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ডা. আবদুর রশীদ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সাবেক দুই অধ্যক্ষসহ চিকিৎসক, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের স্টোরকিপার ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। গতকাল অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক শামসুল আলম স্বাক্ষরিত নোটিসে তাদের ১ থেকে ৩ এপ্রিলের মধ্যে হাজির হতে বলা হয়।

নোটিসে বলা হয়েছে, ‘মিসেস রুবিনা খানম স্বামী : আবজাল হোসেনের মালিকানাধীন রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল কর্র্তৃক কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সরবরাহের নামে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।’ অভিযোগের নিমিত্তে আপনাদের বক্তব্য জানা একান্ত আবশ্যক।

যাদের ডাকা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক রেজাউল করিম, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মায়েনু, মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন ও সহকারী অধ্যাপক নূরুল আলম, সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ও শরিফুল হক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল মাজেদ, হেপ্টালজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুল বরকত মুহাম্মদ আদনান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার পরিচালক ডা. আবদুর রশীদ, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগের প্রভাষক মো. আশরাফুল ইসলাম, প্যাথলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহা. কামরুল হাসান, স্টোরকিপার আবু জায়েদ ও হিসাবরক্ষক আবু যায়েদ।