বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটা গণদাবি ছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এর উল্লেখ ছিল। সেই অনুযায়ী নির্বাচিত হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া অনেকদূর অগ্রসর হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারও অনেকদূর এগিয়েছে। আমি তখন আইনমন্ত্রী ছিলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের মার্চ মাস থেকে। এরই মধ্যে অনেকের ফাঁসি হয়েছে, অনেকের সাজা হয়েছে। এটা একটা বিশাল অগ্রগতি। অস্বীকার করার জো নেই।
বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডে ১৫ জনের সাজা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচজনকে দেশে এনে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে। আর অনেকে এমন দেশে আছে যেখানে মৃত্যুদন্ড নেই। যেমন কানাডায় নূর চৌধুরী আছেন, যুক্তরাষ্ট্রে রাশেদ চৌধুরী আছেন, মোসলেহউদ্দীন আছেন ইংল্যান্ডে। এদের দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে সেই শর্তে যে এদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া যাবে না। সে জন্য তাদের এনে সাজা কার্যকর করা যাচ্ছে না। তারপরেও সরকার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যেসব যুদ্ধাপরাধী ছিল তাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই সময় এই বন্দি তুলে দেওয়ার বিনিময়ে ভারতের সঙ্গে কিছু সীমান্ত সমস্যারও সমাধান করা হয়। কেননা যে ১৯৩ জনের বহর ছিল তাদের রাখা, খাওয়ানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেই দিকটা বিবেচনা করে তাদের ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে ভারত তাদের পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়। কথা ছিল তাদের
পাকিস্তানে বিচার করা হবে। এখন আবার কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে তাদের আন্তর্জাতিক আইনে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার। জাতিসংঘের মাধ্যমে আলোচনা চলছে।
আগামী বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হতে যাচ্ছে। সে জন্য একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। সেই কমিটিতে আমিও আছি। তার জন্মশতবার্ষিকী এমনভাবে পালিত হবে যাতে দেশের প্রতিটি জনগণই তাকে শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। শিক্ষক, ছাত্র বিশেষ করে ছাত্ররা তার কথা আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। তাদের অবশ্যই তার সম্পর্কে জানা উচিত। কেননা তিনি জাতির জনক। তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এদেশের কিছু বিপথগামী সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এবং সদস্যদের হাতে তাকে প্রাণ হারাতে হয়। তারপরেও আমাদের সুযোগ হচ্ছে তার জন্মশতবার্ষিকী পালনের। এর মাধ্যমে তার দেশাত্মবোধ উন্মোচিত করা যাবে। এ থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া যাবে। বিশেষ করে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা তার সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারবে। আমরা তাকে যথাযথ সম্মান প্রদানের চেষ্টায় ত্রুটি রাখব না।
আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেটি হলো আমাদের সংবিধান। এই সংবিধান মাত্র নয়মাসে রচিত হয়েছিল। এত কম সময়ে সংবিধান রচিত হওয়ার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভ। এই স্তম্ভগুলোর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, প্রাণ উৎসর্গ করেছিল। সেই চারটি স্তম্ভ হলো : গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ধর্মনিরেপক্ষতা। এগুলো রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি। এটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।
আমাদের সংবিধানে ১২ নং অনুচ্ছেদে ছিল ধর্মনিরেপক্ষতা নীতি পালনের জন্য রাষ্ট্র কী কী করবে। সেটাও জিয়াউর রহমান পরিবর্তন করেছিলেন। এই যে পরিবর্তন, তার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শকে আঘাত করেছিলেন। প্রকৃত অর্থে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তার মর্যাদাকে অপসারিত করতে চেয়েছিলেন।
২০১০ সালে আওয়ামী লীগ
নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় এসে এই মর্যাদাহানি থেকে দেশকে রক্ষা করে। তারা সংবিধানের মূল চেতনাকে ফিরিয়ে আনতে তৎপর হয়। সেই জন্য তারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করার পর আওয়ামী লীগ সংবিধানের যে মূলনীতিগুলো ছিল তা ফিরিয়ে আনে। ’৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
এটি একটি বিশাল অর্জন। এখন প্রত্যেক নাগরিকের উচিত সংবিধানকে জানা, সংবিধানকে মেনে চলা। কেননা সংবিধানেই রয়েছে ‘সংবিধানকে জানা এবং একে সমুন্নত রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব এবং কর্তব্য।’ সংবিধানের মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে রাষ্ট্রকে অবমাননা করা। আর আমরা অর্থাৎ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ফিরিয়ে এনেছে। দেশ এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যেসব চেতনা অর্জন করেছিলাম তা সংবিধানে প্রতিফলিত হওয়ায় দেশ সমৃদ্ধির দিকে এগোচ্ছে।
উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি মূলত নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের সরকারের ইচ্ছা, সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতির ওপর। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী জনগণের কল্যাণার্থে দেশ চালাচ্ছে। আর সেটি করছে দক্ষতার সঙ্গে,
কৃতিত্বের সঙ্গে। যে জন্য দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের উন্নতি এখন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হচ্ছে। শহরে এখন প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে। এমনকি গ্রামেও প্রচুর রাস্তাঘাট হয়েছে। মানুষ সরকারের প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করছে। আমরা কৃষিতে উন্নতি সাধন করেছি, শিল্পে উন্নতি করেছি, রপ্তানি বেড়েছে। সর্বদিক দিয়ে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। শিক্ষায় উন্নতি সাধন হয়েছে, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যে উদ্দেশ্যে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম সেই উদ্দেশ্যের পরিপূরক একটি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ এবং চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল তার মর্যাদা এই সরকার শুধু রাখছেই না , দেশকে এক অভূতপূর্ব উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তা অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়। একে যুগান্তকারী পদক্ষেপ বললেও ভুল হবে না। তিনি দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইপিজেড গঠনের পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেখানে প্রচুর পরিমাণ কর্মসংস্থান হবে। বিদেশিরাও তার এই পদক্ষেপকে প্রশংসা করছেন। এরই মধ্যে তিনি অনেক পদকে ভূষিত হয়েছেন। বিশেষ করে তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য যা করেছেন তা অতুলনীয়। বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে এটি একটি অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত। রোহিঙ্গারা যেভাবে তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এদেশে আশ্রয়হীনভাবে আসার পর যে ধরনের ব্যবস্থা পেয়েছে তা তারা নিজেরাও কল্পনা করতে পারেনি। আর এতগুলো লোকের খাওয়া-দাওয়া, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা চাট্টিখানি কথা নয়। সেটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সুচারুভাবে করেছেন। আর এতে দেশের অর্থনীতিরও কোনো ক্ষতি হয়নি। এ রকম ব্যবস্থা নেওয়া সারা বিশ্বেই প্রশংসিত হয়েছে।
আমরা অর্থনৈতিক দিক থেকেও এগিয়ে গেছি। আমাদের জিডিপি গ্রোথ ৮% এর ওপরে চলে গেছে। আমাদের
অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বেড়েছে, পোশাকশিল্পে আমরা রপ্তানি করছি। পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে তুলনা করলেও আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। বিশেষ করে জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। শিক্ষার মানে প্রভূত অগ্রগতি ঘটেছে।
রাস্তাঘাটে বেরোলেই উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়। এটি শুধু কথার কথা নয়, বাস্তবেই তা প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্বও এই উন্নয়নকে স্বীকার করছে। সত্যিই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এখন দায়িত্ব এই অগ্রসরতাকে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে এটিই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত।