যে বয়সীই হোক, নারী হলেই গণপরিবহনে ওঠার জন্য তাকে কটু কথা শুনতে হবে। প্রতিবাদ করলে বাসে তোলা হবে না। না হয় নামিয়ে দেওয়া হবে। বাসচালক এবং হেলপারের সঙ্গে বাসযাত্রীরাও মন্তব্য করতে ছাড়ে না। এর বাইরে যৌন হয়রানি তো আছেই। এত কিছুর পরও গত দুই দশকে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গণপরিবহনে নারী যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে।
গতকাল রবিবার লাব্বাইক পরিবহনে রামপুরা থেকে উঠে ফার্মগেট যাবেন বলে উঠেছেন বিবিএর শিক্ষার্থী ফরিদা নাহার। চালকের বামপাশের সিটগুলো ভরে গেছে। ইঞ্জিন কভারে বসেছেন তিনি। চালক বারবার ফরিদার দিকে তাকিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা বলছিল সহকারীর সঙ্গে। এর মধ্যে মৌচাকের সিদ্ধেশ^রীর কলেজের সামনে একদল মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাসে ওঠার জন্য। ড্রাইভার হেলপারকে বলল, ‘ওই ব্যাটা লইয়া ল।’ একটি অশ্লীল ইঙ্গিত করে ফরিদার দিকেও তাকায় সে। চালকের ঠিক পেছনের সিটে বসে থাকা দুজন পুরুষ যাত্রীও বেশ মজা পেলেন। পাঁচজনের সেই তরুণীর দল বাসে উঠল। সিট নেই। তারা দাঁড়িয়ে আছে। চালক অকারণেই ফার্মগেট পর্যন্ত অন্তত ৮-৯ বার জোরে ব্রেক কষল। শিক্ষার্থী মেয়েরা পড়ে যাচ্ছিল। চালক ও হেলপার এক ধরনের মজা নিচ্ছিল। একজন মেয়ে প্রতিবাদ করলে বলে, ‘এত সোনার শরীর হইলে নাইম্যা যান।’
গতকাল মিরপুর ১০ নম্বর থেকে বাংলামোটর এবং কারওয়ান বাজার থেকে মালিবাগ পর্যন্ত কয়েকটি বাসে উঠে দেখা
গেছে নারী যাত্রীদের হয়রানি। বিশেষ করে কিশোরী এবং তরুণী হলেই বাসে উঠতে-নামতে হেলপারদের গায়ে হাত দেওয়ার প্রবণতা। কেউ প্রতিবাদ করলে নোংরা মন্তব্য এবং এর সঙ্গে বাসের ভেতরে বসে থাকা পুরুষ যাত্রীদের কটু মন্তব্য।
সামিয়া প্রায় প্রতিদিনই বাসে যাতায়াত করেন তার দশম শ্রেণির মেয়েকে নিয়ে। তিনি ফার্মগেট থেকে পল্টনে আসেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে একধরনের কোলের মধ্যে তুলে বাসে উঠি। হেলপারের চোখ দেখলেই মনে হয় খেয়ে ফেলবে। কী করব? এত তো সামর্থ্য নেই। ইন্দিরা রোড থেকে পল্টন আসতে সিএনজি অটোরিকশায় ২০০ করে টাকা লাগে। আপ-ডাউন ৪০০। তাই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বাসে উঠি। মেয়েকে বোরকা দিয়েছি। হেলপার আর রাস্তার পশুগুলোর রোষ থেকে বাঁচাতে।’ তিনি বলেন, ‘উঠতে নামতে, চিমটি, শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হাত দেওয়া এসব তো চলেই। বিশেষ করে ১২-১৩ বছরের মেয়েগুলো তো বাসের জন্য একেবারেই নাজুক।’
ফরিদার মতো এমন ১০ জন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। নারীদের জন্য চলাচল একটা আতঙ্ক হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ দরকার। ধাক্কা দিয়ে মেয়েদের ফেলে দেয়। কিছু বলতে পারে না। ট্রমায় ভোগেন এ রকম অনেক মেয়ে রয়েছে। একজন অভিভাবক বলেন, গত জুনে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে তার ১৪ বছরের মেয়ে বলে, ‘বাবা হেলপার আর বাস ড্রাইভারদের যদি নিজ হাতে মারতে পারতাম।’ সেই কিশোরী জানাল কীভাবে এক হেলপার তার গায়ে হাত তুলেছিল।
এদিকে পরিবহন নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান যাত্রী কল্যাণ সমিতি, মহিলা পরিষদ ও ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন বছরে গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে।
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে টঙ্গীর উদ্দেশে আসমানী পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন এক তরুণী (২৫)। যাত্রাপথে গাড়ির সিটে বসার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কারও হাতের স্পর্শে ওই তরুণীর ঘুম ভাঙলে দেখতে পান বাসের চালক- হেলপারসহ আরও কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরেছে। তারা ওই তরুণীর ওড়না টেনে ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় জীবন বাঁচাতে তরুণী বাসের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে আহত হন। পরে তরুণীকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এই ঘটনায় পুলিশ বাসচালক রাসেল ভুইয়া ও তার সহকারী মিরাজকে গ্রেপ্তার করেছে।
বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির ২০১৭ ও ১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন গণপরিবহনে ৫৩টি বড় ধরনের নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। শুধু গত বছরেই ১৭টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাতটি ঘটেছে। এ বছর আরও অন্তত চারটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দু-একজন অপরাধী গ্রেপ্তার বা আটক হলেও বেশির ভাগই থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের উন্নয়নের সবকটি খাতে নারীরা পুরুষের পাশেই রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগিয়ে। সেই নারীদের জন্য গণপরিবহন জ¦লন্ত উনুনের মতো। তাদের জন্য যেখানে বসার বরাদ্দ দেওয়া হয়, তাতেই গলদ। চালক ও সহকারী মিলে তিন-চারজনে এখন গ্যাং হয়ে মেয়েদের টার্গেট করে। বিশেষ করে গ্রাম থেকে গার্মেন্টে চাকরির খোঁজে আসা মেয়েদের ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ধর্ষণের শিকার হয়। কয়টা খবর আমরা পাই। আর চালকের সিটের পাশে মেয়েদের জন্য থাকা সিটগুলোতে কোনো অল্প বয়সী মেয়ে উঠলে যে সব ভাষা চলে, তাতে মেয়েরা ট্রমায় পড়ে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। আর পরিবহন ব্যবসায়ীদেরও চালকদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা থাকতে হবে।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী জেলার শিবপুরের পুরানদিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বাসের ভেতরে এক নারীকে শ্লীলতাহানি করে বাসের চালক ইসমাইল হোসেন ও তার চার সহযোগী, ১০ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ভালুকায় বাসে আটকে রেখে ১৩ বছরের এক কিশোরী পোশাককর্মীকে ধর্ষণ করে বাসের হেলপার হাফিজুল ইসলাম। পরে পুলিশ অভিযুক্ত হেলপারকে আটক করে।
গত ১৯ এপ্রিল রাজধানীর বাসাবোর বৌদ্ধ মন্দির এলাকায় লাব্বাইক বাসে দুই শিক্ষার্থী যৌন হয়রানির শিকার হন। পরে তারা বিষয়টি ট্রাফিক পুলিশকে জানালেও কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার দুই দিন পরই ২১ এপ্রিল বাড্ডা এলাকা থেকে খিলগাঁও যাওয়ার পথে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে যৌন হয়রানির শিকার হন উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পরে পুলিশ বাসের চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনার মাত্র চার দিন পর ২৫ এপ্রিল রাতে রাজধানীতে চলাচলকারী ঠিকানা পরিবহনের একটি বাসে আসাদ গেট থেকে আজিমপুর যাওয়ার পথে যৌন হয়রানির শিকার হন এক তরুণী। এ সময় ওই তরুণীর সঙ্গে তার মাও ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে মেয়েটি এক পুলিশ কনস্টেবলের কাছে সাহায্য চাইলেও সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ করেছিলেন ওই নারী।
৩ মে আশুলিয়ার বাস কাউন্টার থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে পুলিশ ওই তরুণীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা। ১৫ মে দুপুরে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় দেওয়ান পরিবহনের একটি বাসের হেলপার ও চালকের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন তেজগাঁও কলেজের এক শিক্ষার্থী। তবে এ ঘটনায় সম্মানের ভয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়নি মেয়েটির পরিবার। এ ছাড়া ১১ মে রাজধানীতে বাসের মধ্যে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে বাসচালক ও তার সহযোগী, ১৩ মে ময়মনসিংহের চুরখাই এলাকায় বাসচালক ও সহকারীর দ্বারা এক তরুণী, ২১ মে কুড়িল বিশ্বরোডে মাইক্রোবাসে গারো তরুণী ধর্ষণের শিকার হন। পরের মাসে ২৬ জুলাই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর বাইপাসের বাওয়ার কুমারজানী এলাকায় শ্লীলতাহানি থেকে বাঁচতে চলন্ত বাস থেকে লাফ দিলে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শিউলী বেগম (২৮) নামে এক পোশাকশ্রমিক।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণপরিবহনে বিভিন্নভাবে ৯৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগ নারীই চলন্ত বাসে ওঠা-নামার সময় হয়রানির শিকার হন।