অনেকে বলে থাকেন যে ফুটবল ব্যাপারটা নাকি জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাদের এই কথাটার সঙ্গে আমি মোটেই একমত হতে পারি না, ফুটবল এর থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার’। পৃথিবীর সেরা ক্লাব লিভারপুলের কিংবদন্তি কোচ বিল শ্যাংকলির উপরোক্ত বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি সম্ভবত ফুটবল সমন্ধে বলতে গিয়ে লেখকরা সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহার করেছেন। সত্যি বলতে এই কথাটাকে মোটেই অতিশয়োক্তি মনে হয় না। বরং এর সঙ্গে যুক্ত করে আমি বলি ফুটবল বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ‘শক্তিশালী ধর্ম’।
খুব সংক্ষেপে বলি। সেই গুহামানবদের যুগে গোত্রের নিয়মকানুন আর নানাধরনের স্পিরিটিজম (পূর্বপুরুষের আত্মা, গাছপালা, পশু-পাখি, পাথর, নদী সবই ছিল উপাস্য) ছিল মানুষের ধর্ম। এরপর পলিএথেইজম এবং সেটির বিবর্তনে মনোথেইজম। এরপরে অবশ্য ধর্মের বিবর্তন কিছুটা জটিল ও ভিন্ন দিকে বাঁক নেয়, সেটি রূপ নেয় নন-ডিভাইন বা অঐশ্বরিক দিকে। এর ফলাফল ন্যাশনালিজম, সোশ্যালিজম, ক্যাপিটালিজম, ফেমিনিজম, ফ্যাসিজম ইত্যাদি। যেহেতু, এই ‘ভিন্নধর্মী ধর্ম’গুলো প্রথাগত ‘ডিভাইন ধর্মের’ সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে ফলে এদের ‘ধর্ম’ বলে সংজ্ঞায়িত করতে কষ্ট হয়ে যায়। এগুলোও ‘বিশ্বাস’, যেমনটা ‘অর্থনীতিও’।
ইংরেজি ভাষা আর ফুটবল বর্তমান দুনিয়ার সব দেশে দেশেই পৌঁছে গেছে। ইংরেজি যেহেতু কেবলই একটা ‘টুল’ ফলে এর পক্ষে ‘ধর্ম’ হয়ে ওঠা সম্ভব না। তবে ফুটবল হয়ে উঠেছে পোস্ট ন্যাশনালিজম, পোস্ট মডার্নিজমের যুগে সবচেয়ে বেশি পালনীয় ধর্ম। পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও সম্ভবত এটা বলাই যায়, প্রথাগত ধর্ম (একেশ্বরবাদ বা জাতীয়বাদ) পালনে বিশ্বের সাতশ কোটি মানুষ যতটা সময় দেয় তার চেয়ে বেশি দেয় ফুটবলে (খেলা, দেখা, আলোচনা করা)। ফুটবল ঘিরে আছে পবিত্র বিশ্বাস (ক্লাব), অবতার (খেলোয়াড়), ধর্মযুদ্ধ (ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপ, ফুটবলের বিশ্ব আসর) এবং আর সব ধর্মের মতোই উগ্র এবং শান্ত সমর্থক। ফুটবল খেলার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর অগুনতি লেয়ার। এটি একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজবোধ্য এবং দুর্বোধ্য খেলা। কীভাবে? মাঠের দুইপাশে গোলপোস্টে কোনোভাবে বল জড়িয়ে দিতে পারলেই গোল আর যে দল যত বেশি গোল দেবে তারাই জয়ীÑ কেবল এই কথাটা জানা থাকলেই ফুটবল উপভোগ করা যায়। আবার সুবিজ্ঞ থিওলজিস্টদের মতো ফুটবল খেলার ট্যাকটিস, টেকনিক, ইভোলুশন এগুলো বুঝতে এক জীবন পার হয়ে যায়। ৪-৪-২, ফ্লুইড ফর্মেশন, প্রেসিং গেম, অফসাইড ট্র্যাপ, জোনাল ডিফেন্ডিং, নাটমেগ, কাতোনাচ্চিও, টোটাল ফুটবল, গেগেনপ্রেস এই শব্দগুলো যাদের জানা নেই তারা গোলের আনন্দ পেলেও এগুলোকে হিব্রু কিংবা সংস্কৃত ভাষার কঠিন শ্লোক বলেও ভাবতে পারেন। আবার কেবল গোল বোঝা ‘মফিজ’ আর খুঁটিনাটি বোঝা ‘প-িতমশাই’-এর মাঝখানেও ‘আধা বোঝা’, ‘আধা জানা’ লোকের সংখ্যাও প্রচুর (বস্তুতপক্ষে এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ)। আমার কাছে ফুটবল খেলাটাকে একটা ‘ফিজিক্যাল দাবা’ খেলা মনে হয়। ইয়োহান ক্রুইফ যেমন বলতেন যে, ফুটবল পা দিয়ে খেলা হলেও আসলে খেলাটা হয় খেলোয়াড়ের মাথায়। সঙ্গে আছে কোচের ড্রইংবোর্ড। শ্যাংকলি, আরিগো সাচ্চি কিংবা পেপ গার্দিওলারা এর গ্র্যান্ডমাস্টার।
তবে এতেও শেষ হয় না, কেবল তো ফুটবলের কৌশল নিয়ে আলোচনা হলো। এতেই যদি ফুটবল সীমিত থাকত তবে মোটেই একে ধর্ম বলা যেত না। গত এক শতাব্দীতে দেখা গেছে ফুটবল হয়ে উঠেছে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। খেলার মাঠে যতটা ফুটবল হয় তার বেশি সময় ধরে এই নিয়ে আলোচনা, আবেগ, দ্বন্দ্ব। একে ঘিরে ট্রাইবালিজম, ন্যাশনালিজম, গ্লোবালাইজেশন। ফুটবলকে কাজে লাগিয়ে সামরিক সরকাররা ক্ষমতায় টিকে যান, ফুটবল কখনো নিপীড়ন ভুলিয়ে রাখার আফিম আবার কখনো ফুটবল হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ। ফুটবল কখনো শেষমেশ কেবল অবদমন করায়, আবার কখনো হয়ে ওঠে মুক্তির, বিপ্লবের প্রতীক।
তাহলে ফ্যাংকলিন ফয়েরের এই বইটার আলাদা বৈশিষ্ট্য কী? প্রথমত, এর বিষয়বস্তু। প্রথাগত সব ধর্মই যেখানে গ্লোবালাইজেশনের সঙ্গে কখনো লড়াই করছে আবার কখনো সুবিধা নিচ্ছে সেখানে ফুটবল একে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। আর একদিকে পোস্ট ন্যাশনাল অন্যদিকে একেবারেই প্রিমিটিভ সোসাইটির মিশ্র এই গ্লোবাল ভিলেজে ফুটবলকেই কেবল স্বকীয়তা বজায় রেখে চলতে দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বইটার পেছনে লেখকের ডেডিকেশন। বলকান অঞ্চল, পশ্চিম ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এসব জায়গায় তিনি গেছেন ফুটবল ধর্মের নানারকম রূপ দেখতে। সেখান থেকে দুর্দান্ত সাংবাদিকসুলভ দক্ষতায় তুলে এনেছেন দারুণ সব অভিজ্ঞতা। তৃতীয়ত, ফুটবলের প্রতি একেবারেই অনীহা না থাকলে কেবল ইতিহাসের পাঠক হলেও এই বইটা পড়া উচিত। বসনিয়ার গণহত্যা, স্কটল্যান্ডের সাম্প্রদায়িক হিংসা, ইউক্রেনের রেসিজম, বিশ্বযুদ্ধপূর্ব ও এরপরে ইহুদিদের অবস্থান, ল্যাটিন আমেরিকার প্রায় পরাবাস্তবীয় রাজনীতি, ইতালির মাফিয়াচক্র, ইরানের মেয়েদের বাঁধ ভাঙার আকুতি, ৬০ এর দশকে মার্কিন সমাজের রূপান্তর এইসবের ফার্স্টহ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স, ঘটনা ও বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে এই বইয়ে। চতুর্থত, ফয়ের একজন শ্বেতাঙ্গ, মধ্যবিত্ত, আমেরিকান ইহুদি। ফলে আমাদের সঙ্গে তার চিন্তাধারায় অনেকটাই দুই মেরুর ব্যবধান থাকতে পারে। ফয়ের নিজেকে একজন র্যাশনাল, কসমোপলিটিন মানুষ হিসেবেই দেখান। ফলে, আমরা যারা দরিদ্র বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মে র্যাশনালিটি আর কসমোপলিটন চর্চা করতে চাই তাদের জন্য এই বোঝাপড়া জরুরি। ফয়েরের সঙ্গে কেন একমত হব, কেন বিভেদ করব সেটার বোঝাপড়া আমাদের ভাবতে সুবিধা করবে। এমনকি র্যাশনাল দাবির মধ্যেও হেজমনির যে লুকানো কিন্তু শিরশিরে উপস্থিতি সেটা ধরতে পারা দরকার। পঞ্চমত, এই বইয়ের দারুণ ঝরঝরে ভাষা, জায়গায় জায়গায় দারুণ রসালো হয়ে ওঠা এবং দুর্দান্ত শব্দচয়ন। ষষ্ঠত, মজার একটা উপক্রমনিকা। মার্কিন হওয়ার কারণেই সম্ভবত ফয়ের পরিসংখ্যান কিংবা উপাত্তকে ‘ঈশ্বর’ ভাবেন। এখানে বিশ্বকাপ জেতার সম্ভাবনা নিয়ে যে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দিয়েছেন তা কৌতূহলোদ্দীপক। ফুটবল ভালোবাসলে কথাই নেই, কেবল ইতিহাস কিংবা রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ থাকলেও এই বইটা পড়ে দারুণ অভিজ্ঞতা হবে পাঠকের।